সবচেয়ে বেশি বয়সে হজে বাংলাদেশিরা

শারীরিক ও আর্থিক সক্ষমতা থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ করা মুসলমানদের জন্য ফরজ। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যেসব মুসলমান হজে যান, তাদের বয়স বিশ্লেষণ করে বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে! ২০২৬ সালে মোট হজযাত্রীর সাড়ে ৫৭ শতাংশের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছর। সৌদি আরবের সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে বের হয়ে এসেছে— পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশিরাই বেশি বয়সে হজ করেন। অর্থাৎ, বুড়ো বয়সেই শীর্ষে বাংলাদেশের হজযাত্রীরা। এবারে মোট হজযাত্রী ৭৯ হাজার, এর মধ্যে ৬ শতাংশের বয়স ৭০ বছরের বেশি।
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৩ বছর। আর বাংলাদেশিরা এমন এক সময়ে হজে যান, যখন তাদের জীবন একেবারে শেষবেলায়। ফলে হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে গিয়ে নানান জটিলতায় পড়েন। অন্য কোনো মুসলিম দেশের হজযাত্রীরা বাংলাদেশের মতো জটিলতায় পড়েন না। কারণ, সেসব দেশের মানুষ কম বয়সেই হজ পালন করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তালুকদার বেশি বয়সে হজে যাওয়ার কারণ জানিয়েছেন আগামীর সময়কে, ‘অনেকে মনে করেন হজ মানেই জীবনের শেষ ইবাদত; তরুণ বয়সে হজ করলে এর পবিত্রতা রক্ষা করা যাবে না— এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকেই মানুষ বৃদ্ধ বয়সে হজে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন।’
দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজে ছেলেমেয়ের বিয়ে বা ঘরবাড়ি তৈরির মতো দুনিয়াদারির দায়িত্ব শেষ না করে হজে যাওয়াকে অন্যায় মনে করা হয়। পারিবারিক দায়িত্বকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই অধিকাংশের বয়স ৫০ থেকে ৬০ পার হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, চাকরির অবসরকালীন প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থের ওপর নির্ভরতা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যবিত্ত মানুষ চাকরিজীবনের উপার্জনে হজে যেতে পারেন না। তারা অবসরের পর পেনশনের টাকার জন্য অপেক্ষা করেন, যা হাতে আসতে বয়স হয় ৭০ ছুঁইছুঁই।
অধ্যাপক তালুকদারের নিজেরও একটি হজ এজেন্সি আছে। নিজের পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়ে বললেন, ‘খুশির খবর হচ্ছে, ইদানীং দেখতে পাচ্ছি তরুণদের একটি বড় অংশ হজে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ২০২৬ সালে হজযাত্রীদের বয়সভিত্তিক একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে কোন কোন বয়সে বাংলাদেশিরা হজে যান, তার চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তালিকায় ১৮ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন এমন কোনো বাংলাদেশি নেই! ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন প্রায় ১২ শতাংশ। ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন প্রায় ২৫ শতাংশ। ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন সাড়ে ৩২ শতাংশ। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন প্রায় ২৫ শতাংশ। আর ৭০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে হজে যাচ্ছেন এমন বাংলাদেশি আছেন প্রায় ৬ শতাংশ।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানরা যে বয়সে হজে যান, তার সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ৬৫ শতাংশের বেশি হজে যান ৩৫-৫০ বছরে। সেখানে শৈশব থেকেই ‘হজ সেভিং অ্যাকাউন্ট’ শুরু হয়। তরুণরাই সেখানে মূল হজযাত্রী। আর পাকিস্তানে ৪৫ শতাংশ হজ পালন করেন ৪০ থেকে ৫৫ বছরে। ভারতের ৩০ শতাংশই ৪৫-৬০ বছরে হজে যান।
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২.৩ বছর। আর সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরে যান ৫৯ বছর বয়সে। ৫০-৭০ বছর বয়সে হজ পালন করতে গেলে বেশ জটিলতা হয়। প্রথমত তারা শারীরিকভাবে নানা অসুখে ভোগেন। দ্বিতীয়ত, শারীরিকভাবে থাকেন দুর্বল। হজের প্রতিটি রুকন পালনে দিনে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। ৬০ বছরের বেশি ব্যক্তিদের জন্য মক্কার তীব্র গরম ও ভিড়ের মধ্যে এ শারীরিক ধকল সহ্য করা কষ্টসাধ্য। এবার এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২৭ জন হজযাত্রী।
শাহ আমানত হজ কাফেলার চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলী মনে করেন, ‘শারীরিক সক্ষমতা এবং আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেই হজ মুসলমানদের জন্য ফরজ। কিন্তু এ দুটি বিষয় একসঙ্গে যখন করা সম্ভব, তখন আমরা করি না। বার্ধক্যের সময় করতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়।’
হজে গিয়ে মারা যাওয়া বা অসুস্থ হওয়া যাত্রীদের সিংহভাগই বয়স্ক। হার্ট অ্যাটাক, হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা তাদের বেশি হয়। অসুস্থ থাকায় বয়স্কদের তখন অন্যদের সহায়তার প্রয়োজন হয়, যা হজের পূর্ণ মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়।
তরুণ বয়সে হজে যাওয়ার সুফল হচ্ছে, শারীরিক সক্ষমতা। তরুণরা অনায়াসেই হেঁটে মিনা, আরাফাহ ও মুজদালিফার কঠিন পথ পাড়ি দিতে পারেন। জীবনের শুরুর দিকে হজ করলে একজন মানুষের মধ্যে নৈতিক ও আদর্শগত পরিবর্তনের সুযোগ থাকে অনেক বছর। কোনো রোগ বা বার্ধক্যের ক্লান্তি ছাড়া হজের প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় তরুণরা যতটা ভালোভাবে পালন করতে পারবেন, বয়স্কদের পক্ষে তা অনেক সময় সম্ভব হয় না।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং তাদের হজ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের জন্য একটি মডেল। ইন্দোনেশিয়ায় আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে উল্লেখ করে বিসমিল্লাহ ওভারসিজের কর্ণধার আবুল আনোয়ার বলেছেন, “সেই দেশে কোনো শিশু জন্ম নেওয়ার পরই তার নামে ‘হজ সেভিং অ্যাকাউন্ট’ খোলার সংস্কৃতি রয়েছে। মা-বাবা অল্প অল্প করে টাকা জমাতে থাকেন। ফলে ২০-২৫ বছর বয়সেই ওই তরুণের হজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জমা হয়ে যায়।”






