বানোয়াট হাদিস: ইমান ও আমলের নীরব হুমকি

সংগৃহীত ছবি
ইসলামে কোরআনের পর দ্বিতীয় প্রধান শরয়ি দলিল হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ সুন্নাহ বা হাদিসসমূহ। তাই হাদিস বলে কোনো কথা, কাজ বা অনুমোদন মিথ্যাভাবে প্রচার করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩৬)। এ আয়াত মুসলিমকে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই তার নামে মিথ্যা বলার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার আসন প্রস্তুত করে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস: ১০৭)। এটি হাদিসশাস্ত্রের সর্বাধিক মুতাওয়াতির হাদিসগুলোর একটি। ফলে হাদিসের নামে বানোয়াট কথা প্রচার করা শুধু সাধারণ মিথ্যাচার নয়, বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি জঘন্য অপবাদ আরোপ।
কখনো মানুষ ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টি, ওয়াজকে আকর্ষণীয় করা বা মানুষকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে দুর্বল বা জাল হাদিস বর্ণনা করে। কিন্তু ইসলামে ভালো উদ্দেশ্যও মিথ্যার বৈধতা দেয় না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, ‘তোমরা মানুষের কাছে এমন কথা বলো যা তারা বুঝতে পারে।’ (সহিহ আল-বুখারি, মুকাদ্দিমা, তা'লিক সূত্রে)। আর ইমাম মুসলিম তার মুকাদ্দিমায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণী বর্ণনা করেছেন: ‘কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বর্ণনা করে।’ (মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস: ৫)।
হাদিস বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণের জন্য মুসলিম উম্মাহ অনন্য এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গড়ে তুলেছে। ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেছেন, ‘সনদ (বর্ণনাশৃঙ্খল) দ্বীনের অংশ। সনদ না থাকলে যে যা ইচ্ছা তাই বলত।’ (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা)। এ কারণেই মুহাদ্দিসগণ সহিহ, হাসান, দায়িফ ও মাওজু (জাল) হাদিস পৃথক করেছেন, যাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রকৃত বাণী সংরক্ষিত থাকে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়াই অসংখ্য ‘হাদিস’ প্রচার করা হয়, যার অনেকগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)। যদিও আয়াতটি নির্দিষ্ট একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে, তবুও আলেমগণ এটিকে সংবাদ যাচাইয়ের একটি মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
অতএব, হাদিস বর্ণনা বা প্রচারের আগে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ এবং স্বীকৃত মুহাদ্দিসদের তাহকিকের ওপর নির্ভর করতে হবে। আবেগ, লোকমুখে প্রচলিত কথা বা অজানা সূত্রের উদ্ধৃতি কখনোই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী হিসেবে প্রচার করা যাবে না। কারণ একটি মিথ্যাও মানুষের ঈমান, আমল ও দ্বীনের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো সত্যকে গ্রহণ করা, মিথ্যা থেকে বিরত থাকা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ সংরক্ষণে সচেতন ভূমিকা পালন করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




