হাদিসের ঘটনা
চরম কষ্টেও নবীজি (সা.)-এর করুণার দীপ্তি
- নববী চরিত্রে ধৈর্য ও দূরদৃষ্টির মহিমা
- প্রতিশোধের ক্ষমতাতেও নবীজি (সা.)-এর ক্ষমার সিদ্ধান্ত

তায়েফের একটি পাহাড়ের বর্তমান দৃশ্য
মানব ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে কষ্টের গভীরতা মানুষকে ভেঙে দেয় না; বরং তার চরিত্রের মহত্ত্বকে উন্মোচিত করে। মহানবী (সা.)-এর জীবন এমনই অসংখ্য পরীক্ষার সমষ্টি; যেখানে তিনি অবর্ণনীয় নির্যাতন, অবহেলা ও প্রত্যাখ্যানের মুখেও ধৈর্য, দয়া ও আশার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে তায়েফের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি; যেখানে তিনি রক্তাক্ত, অপমানিত ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু ফেরার পথে প্রতিশোধ গ্রহণের সর্বময় শক্তি পাওয়ার পরও তিনি নিয়েছিলেন এমন এক ভূমিকা, যা মানবতার ইতিহাসে সহনশীলতার এক অতুলনীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে বর্ণিত হাদিসে আয়েশা (রা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং তার উত্তরে নবী (সা.)-এর হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা আমাদের সামনে তার দুঃখ-কষ্টের গভীরতা যেমন তুলে ধরে, তেমনি তার অসীম করুণা ও দূরদৃষ্টির পরিচয়ও স্পষ্ট করে। হাদিসটি হলো—
আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত যে, একবার তিনি নবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন কোনো দিন কি আপনার ওপর এসেছিল? তিনি বললেন, আমি তোমার ক্বওম হতে যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, তা তো হয়েছি। তাদের হতে অধিক কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, আকাবার দিন যখন আমি নিজেকে ইবনে আবদে ইয়ালীল ইবনে আবদে কলালের কাছে পেশ করেছিলাম। আমি যা চেয়েছিলাম, সে তার জবাব দেয়নি। তখন আমি এমনভাবে বিষণ্ন চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম যে, কারনুস সাআলিবে পৌঁছা পর্যন্ত আমার চিন্তা দূর হয়নি। তখন আমি মাথা ওপরে ওঠালাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম এক টুকরো মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি সেদিকে তাকালাম। তার মধ্যে ছিলেন জিবরাইল (আ.)। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনার ক্বওম আপনাকে যা বলেছে এবং তারা উত্তরে যা বলেছে, তা সবই আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার কাছে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। এদের সম্পর্কে আপনার যা ইচ্ছে আপনি তাকে হুকুম দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। অতঃপর বললেন, হে মুহাম্মদ (সা.)! এসব ব্যাপার আপনার ইচ্ছাধীন। আপনি যদি চান, তাহলে আমি তাদের ওপর আখশাবাইনকে (শহরের দুই পাশের বড় দুটো পাহাড়) চাপিয়ে দেব (পাহাড় চাপায় ধ্বংস করে দেব)। উত্তরে নবী (সা.) বললেন, বরং আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে আর তার সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। (বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)
এ হাদিসটি নবী (সা.)-এর জীবনের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়কে সামনে আনে, বিশেষ করে তায়েফের ঘটনা। সেখানে তিনি দাওয়াত দিতে গিয়ে চরম অপমান ও নির্যাতনের শিকার হন। তবুও লক্ষ্য করার বিষয়, এত কষ্টের পরও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি।
যখন পাহাড়ের ফেরেশতা প্রস্তাব দিলেন যে চাইলে পুরো জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে, তখন নবী (সা.) তা প্রত্যাখ্যান করেন। বরং তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইমান গ্রহণ করবে। এতে তার অসীম ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং মানবতার প্রতি গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ পায়।
সংক্ষেপে, এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিশোধ নয়; বরং দয়া, ধৈর্য ও দূরদৃষ্টিই একজন মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।



