যে দোয়াকে নবী (সা.) জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঢাল বলেছেন

প্রতীকী ছবি
মানুষ দুনিয়ায় নানা বিপদ থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষার উপায় খোঁজে। কেউ নিরাপত্তার জন্য ঢাল তৈরি করে, কেউ আশ্রয় নেয় শক্তিশালী দুর্গে। কিন্তু পরকালের সবচেয়ে বড় বিপদ জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য কী প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের? রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন কিছু সহজ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ জিকির শিখিয়ে গিয়েছেন, যা মুমিনের পরকালীন মুক্তির অন্যতম পাথেয় হতে পারে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ কিছু জিকিরের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসটিতে এসেছে—
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خُذُوا جُنَّتَكُمْ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، مِنْ عَدُوٍّ حَضَرَ؟ قَالَ: «لا، وَلَكِنْ خُذُوا جُنَّتَكُمْ مِنَ النَّارِ، وَقُولُوا: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلا إِلَهَ إِلا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، فَإِنَّهُنَّ يَأْتِينَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مُقَدَّمَاتٍ وَمُؤَخِّرَاتٍ وَمُنْجِيَاتٍ، وَهُنَّ الْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ»
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঢাল গ্রহণ করো।’ সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোনো শত্রু কি উপস্থিত হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘না, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষার ঢাল গ্রহণ করো। আর বলো,
سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلا إِلَهَ إِلا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ
(উচ্চারণ) ‘সুবহানাল্লাহি, ওয়ালহামদু লিল্লাহি, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার।’
কেননা, কিয়ামতের দিন এই বাক্যগুলো সামনে থেকে ও পেছন থেকে এগিয়ে আসবে এবং মুক্তি দেবে। আর এগুলোই হলো স্থায়ী সৎকর্মসমূহ।’ ( সুনানে কুবরা লিন-নাসায়ী, হাদিস : ১০৬৮৪)
জিকিরগুলোর তাৎপর্য
হাদিসে উল্লেখিত চারটি জিকিরের প্রতিটিরই রয়েছে গভীর তাৎপর্য।
‘সুবহানাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ পবিত্র ও সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত। এ জিকিরের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর পূর্ণতা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ অর্থ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। জীবনের প্রতিটি নিয়ামত, সুস্থতা, জীবিকা ও সুযোগের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা দেয় এই বাক্য।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। এটি তাওহিদের মূল ঘোষণা। একজন মুমিনের বিশ্বাস, ইবাদত ও জীবনাচরণের ভিত্তি এই কালিমা।
‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা কিংবা মানুষের ভয় যেন আল্লাহর আনুগত্যের চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে, এই জিকির মুমিনকে সে শিক্ষা দেয়।
কেন এগুলো মুক্তির পাথেয়?
হাদিসে এই জিকিরগুলোকে ‘জুন্নাহ’ বা ঢালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঢাল যেমন শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি আল্লাহর স্মরণ, তাঁর প্রতি বিশ্বাস এবং আনুগত্যের জীবন পরকালের মুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়। কিয়ামতের দিন এসব জিকির বান্দার উপকারে আসবে বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন।
হাদিসে এগুলোকে ‘আল-বাকিয়াতুস সালিহাত’ বা স্থায়ী সৎকর্মও বলা হয়েছে। দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা ও বাহ্যিক অর্জন একসময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা নেক আমলের প্রতিদান আখিরাতে অবশিষ্ট থাকে।
তবে জিকিরকে কেবল মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পূর্ণ শিক্ষা উপলব্ধি করা যায় না। আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকা, তাঁর প্রশংসা করে নিয়ামতের অকৃতজ্ঞ হওয়া কিংবা তাওহিদের ঘোষণা দিয়ে জীবনে তার দাবি উপেক্ষা করা একজন মুমিনের জন্য সংগত নয়। জিকিরের সঙ্গে থাকতে হবে আন্তরিক বিশ্বাস, ইখলাস, নেক আমল এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা।
দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে আমরা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কাজ ও বিনোদনের পেছনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করি। অথচ দিনের কিছু সময় আল্লাহর জিকিরের জন্য নির্ধারণ করা কঠিন নয়। সকাল-সন্ধ্যায়, নামাজের পর কিংবা অবসর সময়ে এই চারটি জিকির নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি জিকিরগুলোর অর্থ উপলব্ধি করে জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করতে হবে।
আসুন, আমরা প্রতিদিনের জীবনে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ জিকিরগুলোকে স্থান দিই। আল্লাহর স্মরণে হৃদয়কে সজীব রাখি, তাঁর নির্দেশ মেনে চলি এবং পরকালের মুক্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের জিকিরের প্রতি যত্নবান হওয়ার, নেক আমল করার এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



