হাদিসের কথা
যে চার শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ অপছন্দ করেন
- মানবচরিত্রের চার বিপজ্জনক বিচ্যুতি

প্রতীকী ছবি
মানুষের চরিত্র শুধু ব্যক্তিগত গুণাবলির সমষ্টি নয়; তা সমাজের নৈতিক আবহাওয়াকেও নির্ধারণ করে। তাই ইসলাম ব্যক্তি সংশোধনের মধ্য দিয়েই সমাজ সংস্কারের পথ দেখায়। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন চার শ্রেণির মানুষের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন; যাদেরকে আল্লাহতায়ালা অপছন্দ করেন। তারা হলো—এক. কথায় কথায় শপথকারী ব্যবসায়ী, দুই. অহংকারী গরিব, তিন. ব্যভিচারী বৃদ্ধ, চার. অত্যাচারী শাসক। (নাসায়ী, হাদিস, ২৫৭৫, বাইহাক্বী শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪৮৫৩, সহীহুল জামে, হাদিস : ৮৮০)
এই হাদিসের ভেতরে লুকিয়ে আছে মানবচরিত্রের চারটি মারাত্মক বিচ্যুতি, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ধ্বংসাত্মক।
কথায় কথায় শপথকারী ব্যবসায়ী
ব্যবসা-বাণিজ্য ইসলামে অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা; রাসুল (সা.) নিজেও ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু যখন ব্যবসার সঙ্গে মিথ্যা শপথ জড়িয়ে যায়, তখন তা বরকতহীন হয়ে পড়ে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কসম খাওয়া পণ্যের বিক্রি বাড়ালেও তা বরকত নষ্ট করে দেয়।’ (বুখারি, হাদিস ২০৮৭) মিথ্যা বা অপ্রয়োজনীয় শপথের মাধ্যমে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে। আজকের বাজার ব্যবস্থায় এই প্রবণতা আরও প্রকট। বিশ্বাসের জায়গায় কৌশল, সততার জায়গায় কসম। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সত্যবাদিতা ব্যবসার প্রাণ।
অহংকারী গরিব
সাধারণত অহংকার ধন-সম্পদ বা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু যখন একজন দরিদ্র ব্যক্তি অহংকারে ডুবে যায়, তখন তা আরও নিন্দনীয় হয়ে ওঠে। কারণ তার কাছে এমন কিছুই নেই, যার ভিত্তিতে সে অহংকার করতে পারে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
‘নিশ্চয় আল্লাহ কোনো
অহংকারী, গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান, আয়াত :১৮)
দারিদ্র্য মানুষের হৃদয়ে নম্রতা সৃষ্টি করার কথা; কিন্তু যদি তা অহংকারে রূপ নেয়,
তবে তা আত্মিক বিপর্যয়ের লক্ষণ।
ব্যভিচারী বৃদ্ধ
যুবকদের ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির তাড়না একটি বাস্তবতা; তবু তা কোনোভাবেই বৈধ নয়। কিন্তু একজন বৃদ্ধ, যিনি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, যার প্রবৃত্তি তুলনামূলকভাবে প্রশমিত হওয়ার কথা। তার দ্বারা এই পাপ সংঘটিত হওয়া আরও ঘৃণিত। এটি প্রমাণ করে যে, তার অন্তরে আল্লাহভীতি ও নৈতিক সংযমের মারাত্মক অভাব রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না… তাদের একজন হলো ব্যভিচারী বৃদ্ধ।’ (মুসলিম, হাদিস ১০৭)
এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে আঘাত করার শামিল।
অত্যাচারী শাসক
ক্ষমতা আল্লাহর একটি আমানত। এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার কথা; কিন্তু যখন শাসক জুলুম করে, তখন তার অপরাধ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কারণ তার সিদ্ধান্তে অসংখ্য মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন,
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
‘জালিমরা যা করে, আল্লাহ তা থেকে গাফিল—এমনটি কখনো মনে করো না।” (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪২)
একজন জালিম শাসক শুধু নিজেই ধ্বংস হয় না; সে পুরো সমাজকে অন্যায়ের অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
এই চারটি শ্রেণির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম মিল রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানকে অপব্যবহার করেছে। ব্যবসায়ী তার পেশাকে, দরিদ্র তার অবস্থাকে, বৃদ্ধ তার বয়সকে এবং শাসক তার ক্ষমতাকে ভুল পথে ব্যবহার করেছে। ফলে তারা আল্লাহর কাছে ঘৃণিত হয়ে উঠেছে।
এই হাদিস আমাদের জন্য এক কঠিন আত্মসমালোচনার আয়না। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থান থেকে যাচাই করতে পারি। আমাদের কথায় কি অপ্রয়োজনীয় শপথ আছে? আমাদের অন্তরে কি অহংকার লুকিয়ে আছে? আমরা কি নফসের তাড়নায় সীমালঙ্ঘন করছি? কিংবা কোনো দায়িত্ব পেলে তা কি ন্যায়বিচারের সঙ্গে পালন করছি?
ইসলামের শিক্ষা শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা চরিত্র গঠনের এক পূর্ণাঙ্গ দিশা। এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ হলো সততা, বিনয়, সংযম ও ন্যায়পরায়ণতা। আর এ পথ থেকে বিচ্যুতি মানুষকে এমন অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে সে তার রবের অপছন্দের পাত্রে পরিণত হয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com

