ইসলামে সন্তান প্রতিপালনের ভারসাম্য

প্রতীকী ছবি
সন্তান মানুষের জীবনে আল্লাহর দেওয়া মূল্যবান এক আমানত। তাকে খাওয়ানো, পরানো কিংবা লেখাপড়া শেখানো যেমন অভিভাবকের দায়িত্ব। তেমনি তার চরিত্র, মানসিকতা, নৈতিকতা ও ঈমান গড়ে তোলাও অভিভাবকের দায়িত্বের অংশ। এ কারণে সন্তান প্রতিপালনে যেমন ভালোবাসা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শৃঙ্খলা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। তবে শাসনের নামে শিশুকে অপমান, ভয় দেখানো কিংবা মানসিকভাবে আঘাত করাকে ইসলাম সমর্থ্যন করে না। ইসলাম সন্তান লালন-পালনে ভালোবাসা ও শাসনের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَكُمۡ وَ اَهۡلِیۡكُمۡ نَارًا وَّ قُوۡدُهَا النَّاسُ وَ الۡحِجَارَۃُ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)
আয়াতটিতে অভিভাবকের দায়িত্বের গভীর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ধর্মীয় দায়িত্বও।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর শিক্ষা শুরু হয় ভালোবাসা দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে হাস্যরস করতেন এবং আদর করতেন। বুখারির বর্ণনায় এসেছে-
أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَبَّلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ وَعِنْدَهُ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا. فَقَالَ الأَقْرَعُ إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الْوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا. فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ قَالَ " مَنْ لاَ يَرْحَمُ لاَ يُرْحَمُ ".
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদা হাসান ইবনু আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা ইবনু হাবিস বললেন, আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোনো দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার পানে তাকালেন, অতঃপর বললেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)।
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ হয়ে যে, শিশুর সঙ্গে কোমল আচরণ ইসলামী চরিত্রেরই অংশ।
অন্যদিকে সন্তানকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দেওয়াও ইসলামের শিক্ষা নয়। নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) ধীরে ধীরে শিশুকে অভ্যস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
" مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ"
‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজের ব্যাপারে তাদের শাসন করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)।
এখানে শাসনের উদ্দেশ্য অপমান বা প্রতিশোধ নয়; বরং অভ্যাস তৈরি করা ও দায়িত্বশীল করে তোলা।
এই জায়গাটিই বর্তমান সময়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু ভুল করলে তাকে ‘অযোগ্য’, ‘বোকা’ বা ‘কিছুই হতে পারবে না’ বলে অপমান করা শাসন নয়। এতে শিশুর ভুল সংশোধনের বদলে তার আত্মমর্যাদাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শাসন হওয়া উচিত আচরণকে কেন্দ্র করে, ব্যক্তিত্বকে নয়। বলা যেতে পারে, ‘তুমি যে কাজটি করেছ, সেটি ভুল’, কিন্তু ‘তুমি খারাপ’ বলা উচিত নয়। কারণ ভুল একটি আচরণ; মানুষের পুরো পরিচয় নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষাপদ্ধতিতে এই কোমলতা ও প্রজ্ঞার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি ভুলকারীকেও অনেক সময় সরাসরি অপমান না করে সুন্দরভাবে সংশোধন করেছেন। এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেললে সাহাবিরা তাকে শাসন করতে উদ্যত হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের থামিয়ে দেন এবং পরে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেন। (বুখারি, হাদিস : ২২০)। এতে বোঝা যায়, ভুল সংশোধনের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে হেয় করা নয়, তাকে সঠিক পথটি বুঝিয়ে দেওয়া।
সন্তান প্রতিপালনে অভিভাবকের নিজের আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান শুধু কথা শুনে শেখে না, দেখে শেখে। বাবা-মা যদি রাগের সময় সংযম হারান, মিথ্যা বলেন কিংবা পরস্পরকে অপমান করেন, তবে শিশুর কাছেও সেই আচরণ স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। তাই সন্তানকে শাসন করার আগে অভিভাবকের উচিত নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করা। কখনো কঠোর হওয়া প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু কঠোরতা যেন নিষ্ঠুরতায় পরিণত না হয়। আবার ভালোবাসা যেন প্রশ্রয় না হয়ে যায়। ইসলাম এমন এক প্রতিপালন-পদ্ধতি শেখায়, যেখানে সন্তান ভুল করলে তাকে সংশোধন করা হবে, কিন্তু তার মর্যাদা নষ্ট করা হবে না; সীমা শেখানো হবে, কিন্তু ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করা হবে না।
সন্তান আল্লাহর আমানত। সেই আমানতের হক হলো তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে শুধু সফল মানুষ নয়, একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হয়ে উঠতে পারে। আর এই পথের সবচেয়ে সুন্দর নীতি হলো: শাসন থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; শৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু নিষ্ঠুরতা নয়; ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অন্ধ প্রশ্রয় নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



