নবীজীর চোখে আসল গরীব কে?
- জুলুমের মাশুল দিতে হবে নেক আমল দিয়ে

প্রতীকী ছবি
যার অর্থ-সম্পদ কম, যার ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নেই, পরনে ভালো পোশাক নেই, মাথার ওপর নিজের ঘর নেই, কিংবা জীবনের প্রয়োজন মেটাতে অন্যের কাছে হাত পাততে হয়—সাধারণত তাকেই আমরা গরিব বলে মনে করি। সমাজ ও অর্থনীতির বিচারে এই সংজ্ঞা অমূলক নয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত দারিদ্র্যের হিসাব কেবল দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে হয় না। একজন মানুষ দুনিয়ায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেও আখিরাতে নিঃস্ব হতে পারে। আবার দুনিয়ায় দরিদ্র হয়েও সে আল্লাহর কাছে হতে পারে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও সফল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে একদিন এমনই এক প্রশ্ন করেছিলেন, যা মানুষের প্রচলিত ‘গরিব’ ধারণাকে আমূল বদলে দেয়। তিনি বলেন,
أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟
‘তোমরা কি জানো, নিঃস্ব বা দেউলিয়া ব্যক্তি কে?’
সাহাবিরা বললেন, ‘আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সে, যার কোনো দিরহাম বা সম্পদ নেই।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا...
‘আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; অথচ সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে এবং কাউকে প্রহার করেছে।’ এরপর তার নেক আমলগুলো একে একে নির্যাতিত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘মুফলিস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ এমন ব্যক্তি, যার হাতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। দুনিয়ার ব্যবসায় কেউ যদি এমন ঋণগ্রস্ত হয় যে তার সব সম্পদ বিক্রি করেও ঋণ পরিশোধ করা যায় না, তাকে দেউলিয়া বলা হয়। কিন্তু আখিরাতের দেউলিয়াত্ব আরও ভয়াবহ। সেখানে সম্পদের পরিবর্তে মানুষের আসল পুঁজি হলো নেক আমল। কেউ যদি মানুষের অধিকার নষ্ট করে, জুলুম করে, গালি দেয়, অপবাদ ছড়ায়, সম্পদ আত্মসাৎ করে কিংবা অন্যায়ভাবে কাউকে আঘাত করে, তাহলে নিজের ইবাদতগুলোর সাওয়াব সেদিন প্রতিপক্ষকে দিয়ে দেয়া হবে। আর নিজে হবে অসহায় মুফলিস।
বর্তমান সময়ে হাদিসটির গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট কিংবা একটি শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। যাচাই না করে কারও বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা, কাউকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা কিংবা মন্তব্যের মাধ্যমে কাউকে অপমান করা অনেকের কাছে সামান্য ব্যাপার মনে হতে পারে। অথচ এগুলো মানুষের সম্মান ও অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে,
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
‘তোমরা একে অন্যের গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
মানুষের অধিকার বা ‘হক্কুল ইবাদ’ ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ যে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, যদি অন্য মানুষের অধিকার নষ্ট করা হয়ে থাকে। কারও টাকা আত্মসাৎ করলে তা ফেরত দিতে হবে; কারও ওপর জুলুম করলে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে; কারও সম্মানহানি করলে যথাসম্ভব তা সংশোধন করতে হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি জুলুমকে পছন্দ করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে মানুষের জান, মাল ও সম্মানের পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন,
فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ
‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৭)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সেই ব্যক্তি নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়েই কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হবে। অর্থাৎ সে একেবারে ইবাদতহীন মানুষ নয়। তার আমলনামায় অনেক ভালো কাজ থাকবে। কিন্তু মানুষের প্রতি তার অন্যায় সেই নেক আমলগুলোকেই নিঃশেষ করে দেবে।
তাই শুধু কত নামাজ পড়েছি, কত রোজা রেখেছি, কতবার কোরআন পড়েছি—তার হিসাব করলেই হবে না। পাশাপাশি দেখতে হবে, আমার হাত ও মুখ থেকে কত মানুষ নিরাপদ? আমার কথায় কেউ কষ্ট পেয়েছে কি না, আমার আচরণে কেউ অপমানিত হয়েছে কি না, আমার লেনদেনে কারও অধিকার নষ্ট হয়েছে কি না, আমার কোনো সিদ্ধান্তে কারও প্রতি জুলুম হয়েছে কি না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
‘মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ১০)
দুনিয়ায় যার সম্পদ নেই, সে সাময়িকভাবে অভাবগ্রস্ত। কিন্তু যার নেক আমল নেই, কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করতে করতে নিজের নেক আমল হারিয়ে ফেলেছে, তার দারিদ্র্য চূড়ান্ত। দুনিয়ার গরিব মানুষকে দান করে সমৃদ্ধ করা যায়; কিন্তু আখিরাতের সেই নিঃস্বতা থেকে মুক্তির সুযোগ কেবল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কিয়ামতের পর নতুন করে আমল করার কোনো সুযোগ থাকবে না।
এ কারণেই একজন মুমিনের জীবনে আত্মসমালোচনা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন নিজের আমল যাচাই করা দরকার। আজ আমি কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি না, কারও অধিকার নষ্ট করেছি কি না, কারও সম্পর্কে অন্যায় কথা বলেছি কি না, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছি কি না, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু লিখেছি কি না যা অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন করে—এসব প্রশ্ন নিজের কাছে রাখা দরকার। শুধু ইবাদতের সংখ্যা নয়, মানুষের সঙ্গে আচরণের মানও ঈমানের আয়না।
তাই প্রকৃত সফল মানুষ সে নয়, যার সম্পদের পরিমাণ বেশি; প্রকৃত সফল সে-ই, যার আমলনামা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সমৃদ্ধ এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করার দায় থেকে মুক্ত। কোরআন ঘোষণা করেছে,
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
‘সফল হয়েছে সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে; আর ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত : ৯-১০)
তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ‘মুফলিস’ হাদিস শুধু একটি সতর্কবাণী নয়, এটি আত্মশুদ্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ আয়না। নামাজ পড়তে হবে, রোজা রাখতে হবে, জাকাত দিতে হবে; একই সঙ্গে মানুষের সম্মান রক্ষা করতে হবে, অন্যের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে, জিহ্বাকে গালি-অপবাদ থেকে এবং হাতকে জুলুম থেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ কিয়ামতের দিন ‘তুমি কী ইবাদত করেছিলে?’ শুধু তা প্রশ্ন হবে না; মানুষের ওপর কী আচরণ করেছিলে, তারও হিসাব দিতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হাদিসের আলোকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



