হাদিসের কথা
ঋণের হিসাব থেকে রহমতের দরজার নববি বার্তা

প্রতীকী ছবি
মানুষ সাধারণত নিজের অধিকার আদায়ে কঠোর, কিন্তু অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে কৃপণ। অথচ ইসলাম এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে, যেখানে দুনিয়ার লেনদেনও আখিরাতের লাভ-ক্ষতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষত অর্থনৈতিক সম্পর্ক; ঋণ, পাওনা, আদায় এসব ক্ষেত্রে মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। কেউ এখানে কঠোরতা বেছে নেয়, কেউ নেয় দয়া ও উদারতার পথ। আর এই পথই নির্ধারণ করে তার পরিণতি কতটা কল্যাণময় হবে। নিচের এই হাদিসটিতে এমন এক মানসিকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা আজকের স্বার্থকেন্দ্রিক পৃথিবীতে ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ كَانَ الرَّجُلُ يُدَايِنُ النَّاسَ فَكَانَ يَقُوْلُ لِفَتَاهُ إِذَا أَتَيْتَ مُعْسِرًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ لَعَلَّ اللهَ أَنْ يَتَجَاوَزَ عَنَّا قَالَ فَلَقِيَ اللهَ فَتَجَاوَزَ عَنْهُ
আবু হুরাইরা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পূর্বযুগে কোনো এক লোক ছিল, যে মানুষকে ঋণ প্রদান করত। সে তার কর্মচারীকে বলে দিত, তুমি যখন কোনো গরিবের কাছে টাকা আদায় করতে যাও, তখন তাকে মাফ করে দিও। হয়তো আল্লাহতায়ালা এ কারণে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন সে আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভ করল, তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বুখারি, হাদিস: ৩৪৮০)
এই হাদিসের শেষাংশে নিহিত আছে এক গভীর শিক্ষণীয় সত্য; মানুষের প্রতি দয়া, আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়ার দরজা খুলে দেয়। যে ব্যক্তি নিজের অধিকার থাকা সত্ত্বেও অন্যের কষ্ট বুঝে তা ছেড়ে দিতে পারে, সে মূলত নিজের জন্যই আখিরাতের এক বিশাল সম্পদ সঞ্চয় করে। এখানে লক্ষণীয়, ওই ব্যক্তি নিখুঁত কোনো বড় ইবাদতের কারণে ক্ষমা পাননি; বরং তার অন্তরের একটি গুণ; সহানুভূতি ও ক্ষমাশীলতা তাকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের প্রতি সহজ আচরণ ও দয়া প্রদর্শন আল্লাহর রহমত লাভের একটি বড় মাধ্যম।’ (ফাতহুল বারি)
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি (ঋণ) মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮০)
এই আয়াত ও হাদিস একসঙ্গে আমাদের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিকতা দাঁড় করায় যে, শুধু সময় দেওয়া নয়, বরং ক্ষমা করে দেওয়াই সর্বোচ্চ উত্তম।
এখানে একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে। ওই ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে জানতেন না, তিনি ক্ষমা পাবেন কি না; কিন্তু তিনি আশাবাদী ছিলেন যে, ‘হয়তো আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন’। এই আশা তাকে দয়ার পথে পরিচালিত করেছে। এটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর রহমতের প্রতি সৎ প্রত্যাশা একজন মানুষের চরিত্রকে কীভাবে সুন্দর করে তোলে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



