বাবা-মায়ের বার্ধক্য আমাদের দায়িত্বের পরীক্ষা
- জান্নাতের সুযোগ যখন ঘরেই থাকে

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে শৈশব ও বার্ধক্য এমন দুটি সময়, যখন সে অন্যের সহযোগিতার সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী থাকে। শৈশবে সন্তান যেমন বাবা-মায়ের স্নেহ, যত্ন ও ত্যাগের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তেমনি বার্ধক্যে বাবা-মা সন্তানের সহায়তা ও ভালোবাসার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু আধুনিক সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা নিজেদের ঘরেই অবহেলা, একাকীত্ব এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাই আমাদের ভেবে দেখা উচিত; যারা একসময় সন্তানের জন্য জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন, তারা আজ আমাদের ঘরে কতটা নিরাপদ?
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
‘তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
এই আয়াত প্রমাণ করে, ইসলাম বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি শুধু ভরণপোষণের দায়িত্বই দেয়নি; বরং তাদের মানসিক মর্যাদা ও সম্মান রক্ষাকেও অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
আজ অনেক পরিবারে বাবা-মা খাবার ও চিকিৎসা পেলেও প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নন। কারণ বাবা-মাকে শুধু শারীরিক নিরাপত্তা দিলে হবে না, সন্তানের উচিত তাদের মানসিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা। অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের ব্যস্ততা, অবহেলা কিংবা কঠোর আচরণের কারণে নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। কেউ কেউ নিজের ঘরেই নিজেকে অনাহূত অতিথি মনে করেন। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, ক্ষুদ্র পরিবারব্যবস্থা এই সংকটকে আরও গভীর করছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ، مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ»
‘সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক; যে তার বাবা-মায়ের একজন বা উভয়কে বার্ধক্যে পেয়েও জান্নাত অর্জন করতে পারল না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫১)
এই হাদিসে বার্ধক্যে বাবা-মায়ের সেবাকে জান্নাত লাভের অন্যতম বড় সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ বাস্তবে অনেকেই এই সুযোগকে বোঝা মনে করেন।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু তাদের জন্য আলাদা কক্ষ বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সময় দেওয়া, মতামতকে মূল্য দেওয়া, আত্মসম্মানে আঘাত না করা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একটি আন্তরিক কথাই একজন বৃদ্ধ বাবা বা মায়ের হৃদয়ে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
বাবা দিবস বা মা দিবস আমাদের আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে, কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো সারা বছর তাদের সম্মান ও সেবায় নিয়োজিত থাকা। কারণ বাবা-মা কোনো বিশেষ দিনের মানুষ নন; তারা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, আমার বৃদ্ধ বাবা-মা কি সত্যিই আমার ঘরে নিরাপদ, সম্মানিত ও সুখী? যদি উত্তর ইতিবাচক না হয়, তবে এখনই তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার সময়। কারণ তাদের সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর তাদের সেবার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জান্নাতের পথ।




