ইনফ্লুয়েন্সার যুগে ইসলামের সতর্কবার্তা

প্রতীকী ছবি
আজকের মানুষ শুধু তথ্যের ভোক্তা নয়, একই সঙ্গে সে প্রতিনিয়ত অন্যের চিন্তা, রুচি ও জীবনযাপনের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। একটি ছবি, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কিংবা একটি ছোট্ট মন্তব্য মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কাছে। কে কী পরছেন, কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কোন পণ্য ব্যবহার করছেন কিংবা কোন বিষয়ে কী ভাবছেন, তার অনেকটাই এখন নির্ধারিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৃশ্যমান জগত দ্বারা। ফলে প্রভাব বিস্তারের পুরনো কাঠামোও বদলে গেছে। একসময় মানুষের চিন্তা ও রুচি গঠনে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিবিদ কিংবা বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল প্রধান; আজ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক শক্তিশালী শ্রেণি, যাদের আমরা বলি ‘ইনফ্লুয়েন্সার’। তারা শুধু মানুষের পছন্দ-অপছন্দকেই প্রভাবিত করছেন না, অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছেন জীবনধারা, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণের অনুকরণীয় মডেল।
ইনফ্লুয়েন্সার বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের পরিচিতি, জ্ঞান, দক্ষতা কিংবা জীবনধারার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের চিন্তা, পছন্দ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন। পণ্য বা সেবা নির্বাচন থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, জীবনযাপন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসেও তাদের প্রভাব পড়ে।
এই নতুন সংস্কৃতির যেমন ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা নৈতিক ঝুঁকি। ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলাম মানুষের জীবনের কোনো ক্ষেত্রকেই নৈতিকতার বাইরে রাখে না। একজন মানুষ কতজনের কাছে পরিচিত, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কী প্রচার করছেন, কেন করছেন এবং তার প্রভাব মানুষের জীবনে কী ফল বয়ে আনছে তা।
খ্যাতি নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক লক্ষ্য
মানুষ স্বভাবতই সম্মান, মর্যাদা ও পরিচিতি পেতে চায়। পরিচিত হওয়া নিজে কোনো অপরাধ নয়। কোনো মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, সেবা কিংবা কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন। ইসলামের আপত্তি খ্যাতির অস্তিত্বে নয়; বরং খ্যাতির প্রতি অন্ধ আকাঙ্ক্ষা, অহংকার এবং মানুষের প্রশংসাকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানোর মধ্যে।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)। অর্থাৎ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা নয়, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতাই প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের সাফল্য মাপা হয় লাইক, শেয়ার, ফলোয়ার ও সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা দিয়ে। অথচ এসব সংখ্যা মানুষের কাছে জনপ্রিয়তার পরিচায়ক হতে পারে, আল্লাহর কাছে মর্যাদার নয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কত মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে?’ এর চেয়ে ‘আমি যাদের প্রভাবিত করছি, তাদের জন্য আমি কী রেখে যাচ্ছি?’
খ্যাতি ও লোকদেখানোর বিপদ
খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা যখন মানুষের নিয়তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) লোকদেখানো ও মানুষের কাছে নিজের আমল প্রচারের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তার লোকদেখানো প্রকাশ করে দেবেন; আর যে ব্যক্তি মানুষের কাছে নিজের আমল প্রচার করে, আল্লাহ তার প্রচার প্রকাশ করে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৪৯৯)
এই সতর্কবার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো ভালো কাজ মানুষের সামনে তুলে ধরা সবসময় রিয়া বা লোকদেখানো নয়। কখনো ভালো কাজের প্রচার অন্যদের উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু যখন মানুষের প্রশংসা পাওয়াই কাজের মূল উদ্দেশে পরিণত হয়, তখন আমলের অন্তর্গত নিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে একটি মেষপালের মধ্যে ছেড়ে দিলে মেষপালের যে ক্ষতি হয়, কোনো ব্যক্তির সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি লোভ তার দ্বীনের জন্য তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৭৬)
অতএব জনপ্রিয়তা যদি মানুষকে সত্য, শালীনতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করে, তবে সেই জনপ্রিয়তা আর সাফল্যের পরিচায়ক থাকে না; বরং তা আত্মার জন্য পরীক্ষায় পরিণত হয়।
অনুসারী বাড়ানোর জন্য
সবকিছু করা যাবে না
ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই অনেক কনটেন্ট নির্মাতার প্রধান লক্ষ্য। দর্শক বাড়াতে কেউ চমকপ্রদ শিরোনাম ব্যবহার করেন, কেউ অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেন, কেউ ব্যক্তিগত জীবনের এমন বিষয় প্রকাশ করেন যা প্রকাশ না করাই শালীনতার দাবি, আবার কেউ অশ্লীলতা ও অস্বাভাবিক আচরণকে বিনোদনের উপকরণ বানান।
ইসলাম মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নৈতিক সীমা ভেঙে দেওয়ার অনুমতি দেয় না। আল্লাহ মুমিন পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩০)। পরের আয়াতে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা ও শালীনতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩১)
তাই অনুসারী বাড়ানোর জন্য অশ্লীলতা, নগ্নতা, অশালীন ভাষা কিংবা যৌন আবেদননির্ভর উপস্থাপনাকে স্বাভাবিক করে তোলা ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তথ্য প্রচারে
দায়িত্বশীলতা
ইনফ্লুয়েন্সারদের হাতে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, তথ্যেরও বড় ক্ষমতা রয়েছে। একটি ভুল তথ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সম্প্রদায় সম্পর্কে যাচাইহীন বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া যেমন সামাজিক ক্ষতি করতে পারে, তেমনি সৃষ্টি করতে পারে অপবাদ, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি।
কোরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে: ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও।’ (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ৬)
ডিজিটাল যুগে এই আয়াতের শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংবাদ চোখে পড়লেই শেয়ার করা, চমকপ্রদ তথ্য যাচাই না করেই ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ‘ভিউ’ পাওয়ার জন্য বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ব্যবহার করা একজন মুসলিমের জন্য দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না।
সময়ও একটি আমানত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সময় ব্যবহারের ধরনও বদলে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় কাজের পাশাপাশি অযথা স্ক্রলিং, একের পর এক ভিডিও দেখা কিংবা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করার প্রবণতা অনেকের জীবনে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত: সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রেও সময়ের এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কনটেন্ট তৈরি, দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা যদি দায়িত্বশীলভাবে করা হয়, তা উপকারী হতে পারে। কিন্তু তা যদি নামাজ, পরিবার, জ্ঞানচর্চা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা আত্মশুদ্ধির সময় কেড়ে নেয়, তবে সেই ব্যবহারের মূল্য নতুন করে ভাবতে হবে।
কেমন হওয়া উচিত একজন মুসলিম
ইনফ্লুয়েন্সার?
প্রথমত, তার নিয়ত হতে হবে পরিষ্কার। জনপ্রিয়তা তার উদ্দেশ্য নয়, বরং কল্যাণকর কাজের একটি অনুষঙ্গ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাকে সত্যনিষ্ঠ হতে হবে। কনটেন্ট আকর্ষণীয় করার জন্য মিথ্যা, গুজব, প্রতারণা বা অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, শালীনতার সীমা রক্ষা করতে হবে। চতুর্থত, উপার্জনের ক্ষেত্রেও হালাল-হারামের বিধান মেনে চলতে হবে। কোনো পণ্য বা সেবার প্রচার করলে তার প্রকৃতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে মিথ্যা দাবি করা যাবে না। পঞ্চমত, নিজের প্রভাব সম্পর্কে জবাবদিহির অনুভূতি থাকতে হবে।
কারণ একজন সাধারণ মানুষের ভুল হয়তো কয়েকজন মানুষ দেখবে; কিন্তু একজন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারের ভুল হাজারো মানুষ অনুসরণ করতে পারে। তাই প্রভাব যত বড়, দায়িত্বও তত বড়।
আমাদের করণীয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ইসলামের দাবি নয়। বরং এর ব্যবহারকে নৈতিক ও কল্যাণমুখী করা জরুরি। যারা কনটেন্ট তৈরি করেন, তাদের উচিত নিজেদের প্রতিটি বক্তব্য ও উপস্থাপনা সম্পর্কে ভাবা: এটি কি সত্য? এটি কি শালীন? এটি কি মানুষের উপকার করবে? এটি কি কাউকে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে? এর মাধ্যমে কি আমি এমন কোনো সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছি, যা আমার নিজের জন্যও ক্ষতিকর?
আর যারা অনুসরণ করেন, তাদেরও দায়িত্ব কম নয়। প্রত্যেক জনপ্রিয় মানুষ আদর্শ নন, প্রত্যেক ভাইরাল বক্তব্য সত্য নয় এবং প্রত্যেক বহুল অনুসৃত জীবনধারা অনুসরণযোগ্য নয়। একজন মুসলিমের মানদণ্ড হবে কোরআন-সুন্নাহর নৈতিক শিক্ষা, জনপ্রিয়তার সংখ্যা নয়।
ইন্টারনেট তারকা বা ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি আধুনিক পৃথিবীর একটি বাস্তবতা। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না; বরং মানুষের প্রতিটি ক্ষমতাকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহারের শিক্ষা দেয়। একজন মানুষ কত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, সেটি তার প্রভাবের পরিমাণ; কিন্তু সেই প্রভাব কল্যাণ না অকল্যাণ বয়ে আনছে, সেটিই তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করবে।
তাই লাইক, ফলোয়ার ও ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় আত্মপরিচয় হারিয়ে না ফেলে আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের করতালি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কাজের হিসাব চিরস্থায়ী। ডিজিটাল দুনিয়ার বিশাল প্রভাবকে যদি সত্য, শালীনতা, জ্ঞান ও কল্যাণের পথে ব্যবহার করা যায়, তবে ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া কেবল জনপ্রিয়তার পরিচয় হবে না; তা হয়ে উঠতে পারে মানুষের উপকারের একটি মাধ্যম। আর এটাই হবে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রভাবশালী হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক







