আশুরা নাজাত কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির দিন
- আশুরার ফজিলত ও তাৎপর্য

প্রতীকী ছবি
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এটি আল্লাহর সম্মানিত ও পবিত্র মাসগুলোর অন্যতম। এ মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম, যা ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি শুধু একটি স্মরণীয় দিবস নয়; বরং এটি ঈমান, তাওয়াক্কুল, কৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি; এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।’ (সুরা আত-তাওবা : ৩৬)
মহররম সেই চারটি সম্মানিত মাসের একটি। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬৩)
আশুরার দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবী মূসা (আ.)-এর এক ঐতিহাসিক ঘটনা। দীর্ঘদিনের অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে আল্লাহ তাআলা এ দিন মূসা (আ.) ও তার অনুসারীদের মুক্তি দান করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর আমি মূসা ও তাঁর সঙ্গীদের সবাইকে রক্ষা করলাম, তারপর অপর পক্ষকে ডুবিয়ে দিলাম।’ (সুরা শু‘আরা : ৬৫-৬৬)
এই মহান নাজাতের দিন উপলক্ষে মূসা (আ.) আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য রোজা পালন করেছিলেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে দেখলেন, ইহুদিরাও এ দিনে রোজা রাখে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলল, এ দিন আল্লাহ মূসা (আ.)-কে নাজাত দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করলেন, ‘মূসার সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ (বুখারি, হাদিস : ২০০৪)
এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।
আশুরার রোজার সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো, এটি এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
এখানে মূলত ছোটখাটো গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে। তবে আল্লাহর রহমত এত ব্যাপক যে, একটি দিনের রোজার বিনিময়ে তিনি বান্দাকে এক বছরের পাপ থেকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার দিনের মতো অন্য কোনো দিনের রোজার এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি।’ (বুখারি, হাদিস : ২০০৬)
তবে ইসলাম শুধু অনুসরণ নয়, স্বাতন্ত্র্যেরও শিক্ষা দেয়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষদিকে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে, তিনি আগামী বছর বেঁচে থাকলে ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ মহররমও রোজা রাখবেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে অবশ্যই নবম তারিখও রোজা রাখব।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৩৪)
এর উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহার করা। এ কারণে ফকিহগণ বলেছেন, আশুরার রোজার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো ৯ ও ১০ মহররম অথবা ৯, ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা। তবে কেউ যদি শুধু ১০ মহররমও রোজা রাখে, তাহলেও আশুরার ফজিলত লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।
আশুরা আমাদের শুধু একটি নফল রোজার শিক্ষা দেয় না; বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আসে। মূসা (আ.) যখন সমুদ্রের তীরে পৌঁছলেন এবং পেছনে ফেরাউনের বিশাল বাহিনী, তখন তাঁর সঙ্গীরা হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘কখনো নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন; তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।’ (সুরা আশ-শু‘আরা, আয়াত : ৬২)
এই ঈমান ও তাওয়াক্কুলই শেষ পর্যন্ত বিজয়ের পথ খুলে দিয়েছিল।
বর্তমান সময়ে মুসলমানদের জন্য আশুরার শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের নানা সংকট, হতাশা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও আল্লাহর প্রতি আস্থা হারানো যাবে না। পাশাপাশি এ দিনটি তওবা, ইস্তিগফার, নফল ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ।
অতএব, আশুরার আগমনে আমাদের উচিত আন্তরিকতার সঙ্গে রোজা রাখা, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, গুনাহ থেকে তওবা করা এবং নবী করিম (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে জীবন গড়ে তোলা। কারণ আশুরা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সাহায্য কখনো ব্যর্থ হয় না, সত্য শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয় এবং কৃতজ্ঞ বান্দাদের জন্য তাঁর রহমতের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আশুরার ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: শায়খুল হাদিস, জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম রহ. কক্সবাজার। সদস্য, শরীয়াহ সুপারভাইজারি কমিটি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি।




