সৌহার্দপূর্ণ সমাজ গঠনের দুই মৌলিক ভিত্তি

প্রতীকী ছবি
সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মানুষ যতই প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠছে, মানুষের ভেতরের একাকিত্ব যেন ততই গভীর হচ্ছে। একই শহরে, একই ভবনে, এমনকি একই ঘরে বসবাস করেও মানুষ পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল হচ্ছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচয় কমছে, অপরিচিত মানুষের প্রতি তৈরি হচ্ছে অকারণ সংশয়। অথচ একটি সুন্দর সমাজ শুধু আইন-কানুন কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার ভিত গড়ে ওঠে মানুষের পারস্পরিক মমতা, সৌহার্দ্য ও নিরাপত্তাবোধের ওপর। এই মানবিক সমাজ নির্মাণে ইসলামের রয়েছে অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দুটি শিক্ষা: (এক) মানুষকে খাদ্য খাওয়ানো (দুই) পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামের কোন কাজটি উত্তম? তিনি বললেন—
تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَىٰ مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ
‘তুমি খাদ্য খাওয়াবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে।’ (বুখারি, হাদিস: ১২)
হাদিসটির প্রথম শিক্ষা মানুষের ক্ষুধার প্রতি দায়িত্ববোধ। ক্ষুধার্তকে আহার করানো শুধু দান নয়, তার মানবিক মর্যাদা রক্ষারও একটি অনন্য প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের প্রশংসা করে বলেছেন,
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا
‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য খাওয়ায়।’ (সুরা ইনসান, আয়াত: ৮)
ইসলাম এমন সমাজ চায়, যেখানে কারও ঘরে চুলা জ্বলছে কি না, সেটিও অন্যের বিবেচনার বিষয় হবে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ
‘সে মুমিন নয়, যে নিজে পেটভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১২)
আর সালাম হলো মানুষের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ার ভাষা। ‘আসসালামু আলাইকুম’ নিছক সম্ভাষণ নয়; এটি শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের দোয়া। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রচলন ঘটাও।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৪)
একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ ঈমান অর্জিত হয় না এবং সালামের প্রসার সেই ভালোবাসা সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। অর্থাৎ সালাম কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, এটি হৃদয়ের দূরত্ব কমানোর একটি ঈমানি অনুশীলন।
আজ মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে, অথচ পাশের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। এই বিচ্ছিন্নতার সামান্য খাবার ব্যবস্থাকরণ ক্ষুধার্তের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে পারে, আর একটি আন্তরিক সালাম অপরিচিত মানুষের হৃদয়েও নিরাপত্তার অনুভূতি জাগাতে পারে।
তােই আসুন! সৌহার্দপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে আমরা সকলেই নিজ নিজ আচরণে প্রকাশ করি। আমাদের খাবারের টেবিলে যেন অসহায়ের অংশ থাকে, আমাদের দরজায় যেন প্রতিবেশীর জন্য উন্মুক্ততা থাকে, আর আমাদের কণ্ঠে যেন পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য থাকে শান্তির সালাম। কারণ সমাজ বদলের জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না; কখনো একটু খাবার, একটি সালাম এবং একটু হাসিমাখা আন্তরিকতাই মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সেতুটি আবার নির্মাণ করে দিতে পারে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক





