সমাজ ধ্বংসের নীরব ঘাতক তিন অপরাধ

প্রতীকী ছবি
মানুষের মুখের ভাষা যেমনভাবে ভালোবাসা, শান্তি ও সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে। তেমনি অসতর্ক একটি বাক্য ভেঙেও দিতে পারে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ভিত্তিকে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে গীবত, অপবাদ ও চরিত্রহননের মতো পাপগুলো আরও সহজ, দ্রুত এবং ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া, কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা কিংবা সম্মানহানি করার প্রবণতা উদ্বেগজনক হাড়ে বেড়ে চলেছে। ইসলাম এ তিনটি অপরাধকে শুধু নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে নয়, বরং সমাজ ধ্বংসের মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে।
এক. গীবত : যাকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় উল্লেখ করা, যা সে অপছন্দ করে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, যদি সেই বিষয়টি সত্য হয়? তিনি বললেন, ‘যদি তা সত্য হয়, তবে তুমি গীবত করলে; আর যদি সত্য না হয়, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা গীবতের জঘন্যতা বোঝাতে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কারও গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, গীবত শুধু একটি মুখের অপরাধ নয়। এটি মানুষের সম্মান ও সামাজিক বিশ্বাসকেও ধ্বংস করে দেয়।
দুই. অপবাদ: যাতে নিরপরাধের ওপর জুলুম করা হয়। এ জন্যই অপবাদ বা মিথ্যা অভিযোগ ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। এতে শুধু একজন ব্যক্তির মর্যাদা নষ্ট করা হয়না। এর দ্বারা ব্যক্তির পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক অবস্থানকেও বিপন্ন করে তুলা হয়।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৫৮)
অন্য আয়াতে আরও কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, ‘যারা সতী-সাধ্বী, সরলবিশ্বাসী মুমিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত : ২৩)
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিথ্যা পোস্ট, সম্পাদিত ছবি কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্মান অনেক সময় আর ফিরে আসে না।
তিন. চরিত্রহনন: যাতে সমাজে অবিশ্বাসের বিষবাষ্প জন্ম নেয়। চরিত্রহনন এমন একটি অপরাধ, যা ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক আস্থা ধ্বংস করে দেয়। রাজনৈতিক মতভেদ, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণে অনেকেই অন্যের চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটাতে দ্বিধা করেন না। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে ফিতনা বা সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০; মুসলিম, হাদিস : ৪০) অর্থাৎ একজন প্রকৃত মুসলমান কখনো তার কথার মাধ্যমে অন্যের সম্মান নষ্ট করবে না।
আগে গীবত হতো মুখে মুখে, এখন তা হয় কিবোর্ড ও মোবাইলের পর্দায়। একটি মন্তব্য, একটি শেয়ার, একটি ইমোজি কিংবা একটি ফরওয়ার্ডও কখনো গীবত, অপবাদ বা চরিত্রহননের অংশ হয়ে যেতে পারে। তাই ডিজিটাল মাধ্যমেও মুমিনের দায়িত্ব একই। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য সদা প্রস্তুত একজন পর্যবেক্ষক রয়েছে।’ (সুরা কাফ, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শুধূ মুখের কথা নয়, আমাদের লিখিত কথাও আল্লাহর কাছে হিসাবযোগ্য।
গীবত, অপবাদ ও চরিত্রহনন মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে, বন্ধুত্ব ভেঙে দেয় এবং সমাজে বিদ্বেষ ছড়ায়। অনেক সময় একটি ভিত্তিহীন গুজব সংঘর্ষ, প্রতিহিংসা এমনকি হত্যাকাণ্ডেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই ইসলাম মানুষের সম্মানকে কাবা শরিফের মর্যাদার সঙ্গে তুলনীয় বলে গুরুত্ব দিয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য এই দিন, এই মাস ও এই নগরের মতোই পবিত্র।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৪১; মুসলিম, হাদিস : ১৬৭৯)
কাজেই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, কোনো সংবাদ শুনলেই তা প্রচার না করে যাচাই করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
পাশাপাশি একজন মুমিনের দায়িত্ব হচ্ছে, অন্যের দোষ প্রকাশের পরিবর্তে তার জন্য দোয়া করা, গোপনে নসিহত করা এবং নিজের জিহ্বা ও আঙুলকে সংযত রাখা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
গীবত, অপবাদ ও চরিত্রহনন একটি সভ্য সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেওয়ার নীরব অস্ত্র। তাই আমাদের সকলের এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
মহাস আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার গীবত, পরনিন্দা, অপবাদ ও অন্যের চরিত্র হননের মতো মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেমও ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




