পরিবারে খরচ আগে, বাইরের দান পরে

প্রতীকী ছবি
ইসলাম দান-সদকার প্রতি মানুষকে গভীরভাবে উৎসাহিত করেছে। অসহায়, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু দানের ক্ষেত্রেও ইসলাম একটি সুন্দর ভারসাম্য শিখিয়েছে। মানুষ যেন বাইরের মানুষের জন্য ব্যয় করতে গিয়ে নিজের পরিবার-পরিজনের অধিকার নষ্ট না করে। বরং নিজের দায়িত্বের মানুষের প্রয়োজন পূরণ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যদের জন্য ব্যয় করতে হবে। কারণ পরিবারের জন্য করা বৈধ ব্যয়ও আল্লাহর কাছে সওয়াবের কাজ হতে পারে।
এ বিষয়ে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, এক ঈদুল আজহা বা ঈদুল ফিতরের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহে গেলেন। সালাত আদায়ের পর তিনি লোকদের উপদেশ দিলেন এবং তাদের সদকা করার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি নারীদের কাছে গিয়ে বললেন—
يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ، فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ
‘হে নারীগণ! তোমরা সদকা করো। কেননা আমাকে তোমাদের অধিকসংখ্যককে জাহান্নামের অধিবাসী হিসেবে দেখানো হয়েছে।’
তারা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এর কারণ কী?’ তিনি বললেন—
تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ، وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ
‘তোমরা বেশি অভিশাপ দাও এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের সদকা করার প্রতি উৎসাহিত করেন।
তিনি যখন ঘরে ফিরে এলেন, তখন ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী যায়নাব (রা.) তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তাঁকে বলা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল! যায়নাব এসেছেন।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন যায়নাব?’ বলা হলো, ‘ইবনে মাসউদের স্ত্রী।’ তিনি বললেন, ‘তাকে আসতে দাও।’
জায়নাব (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আজ আপনি সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার কিছু অলংকার আছে। আমি তা সদকা করতে চাই। কিন্তু ইবনু মাসউদ মনে করেন, আমার সদকার ক্ষেত্রে তাঁর ও তার সন্তানদেরই বেশি হক রয়েছে।’
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—
صَدَقَ ابْنُ مَسْعُودٍ، زَوْجُكِ وَوَلَدُكِ أَحَقُّ مَنْ تَصَدَّقْتِ عَلَيْهِمْ
‘ইবনে মাসউদ ঠিকই বলেছেন। তোমার স্বামী ও তোমার সন্তানই তোমার সদকার অধিক হকদার।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪৬৬)
এ হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। দান করতে হলে সবার আগে দেখতে হবে, আমার ওপর কার অধিকার রয়েছে। একজন স্ত্রী যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবগ্রস্ত স্বামী ও সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করেন, তা শুধু অর্থ ব্যয় নয়; সঠিক নিয়তে তা সদকার সওয়াবের কারণও হতে পারে। একইভাবে একজন স্বামী যখন স্ত্রী-সন্তানের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করেন আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে, তখন তাঁর এই পারিবারিক ব্যয়ও সওয়াবের কাজ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ
‘কোনো ব্যক্তি সওয়াবের নিয়তে তার পরিবারের জন্য ব্যয় করলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫)
অর্থাৎ পরিবারে খরচ করার ক্ষেত্রে একসঙ্গে দুটি কল্যাণ অর্জিত হতে পারে: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয়ের সওয়াব এবং পারিবারিক সম্পর্ক ও দায়িত্ব রক্ষার সওয়াব। বিশেষ করে স্বামীর ওপর স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ একটি দায়িত্ব; তাই সেটি অবহেলা করে বাইরে দান করে নিজেকে বড় দানশীল ভাবার সুযোগ নেই। দায়িত্বের মানুষের অধিকার আদায় করাই আগে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাইরের দরিদ্রদের দান করা অনুচিত। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরও সাহায্য করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কিন্তু দান ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। নিজের ওপর যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব, তাদের প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে অন্যত্র দান করা ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নয়।
তাই একটি পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত পরস্পরের প্রয়োজনকে সম্মান করা। স্বামী স্ত্রীর জন্য ব্যয় করবেন দায়িত্ব ও ভালোবাসার সঙ্গে; স্ত্রীও সামর্থ্য থাকলে স্বামী ও সন্তানদের প্রয়োজনে ব্যয় করবেন মমতা ও সওয়াবের নিয়তে। তখন সংসারের অর্থ শুধু ভোগে ব্যয় হবে না, বরং ভালোবাসা, দায়িত্ব, আত্মীয়তা রক্ষা ও সদকার সওয়াবের মাধ্যমেও পরিণত হবে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক



