রহমতের দরজা খুলে দেয় যে আমল

প্রতীকী ছবি
দয়া মহান আল্লাহর এক বিশেষ গুণ। তিনি পরম দয়ালু, অসীম করুণাময়। তাঁর রহমত সমগ্র সৃষ্টিজগতৎকে পরিবেষ্টন করে আছে। আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, মানুষ, পশু-পাখি সবকিছুই তাঁর দয়ার পরশে সিক্ত।
যে ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টিজীবের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করে, আল্লাহতাআলা তার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং তাকে নিজের বিশেষ রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেন। মানুষের প্রতি দয়া, অসহায়দের সাহায্য, এতিমদের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেওয়া, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করা, গরিব-মিসকিনের কষ্ট লাঘব করা, এমনকি পশু-পাখির প্রতিও সদয় আচরণ করা, এসবই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানওয়ালা তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম প্রধান উপায় হলো তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে শুধু দয়ার কারণে মানুষ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেছে।
বুখারি ও মুসলিমে একটি ঘটনা বিবৃত হয়েছে। যার বিবরণ হলো, চলতি পথে এক লোকের পিপাসা পেয়েছিল। পিপাসার কী কষ্ট তা সে অনুভব করতে পারছিল। এ অবস্থায় একটা কুয়ার পানি দ্বারা তার নিজ পিপাসা নিবারণের সুযোগ হয়েছিল। পিপাসা নিবারণের পর যখন চলে যাবে, অমনি দেখতে পায় এক পিপাসার্ত কুকুর, যেটি জিহ্বা দিয়ে কাদা চেটে চেটে পিপাসা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। এ দৃশ্য তার মনে রেখাপাত করে বসল। সে চিন্তা করল ক্ষণিক আগে পিপাসার যে কষ্ট তার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, সেই একই কষ্ট এখন এই কুকুরটি ভোগ করছে। এভাবে কাদামাটি চেটে কি সে তার পিপাসা নিবারণ করতে পারবে? কুকুরটির জন্য তার মন কেঁদে উঠল। সে কালবিলম্ব না করে কুয়ায় নেমে পড়ল এবং নিজ মোজায় পানি ভরে নিল।
এখন সে কুয়া থেকে কীভাবে উঠে আসবে? খাড়া কুয়ার নিচ থেকে উঠতে হলে দুই হাত দিয়ে কিছু ধরে ধরেই উঠতে হবে। আবার দুই হাত দিয়ে কিছু ধরলে মোজা তুলবে কী করে? অগত্যা সে মোজাটি মুখ দিয়ে কামড়ে ধরল আর হাত দ্বারা কুয়ার দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে আসল। তারপর সে কুকুরটির পিপাসা নিবারণ করল। কুকুরটির প্রতি তার এ দরদ আল্লাহতাআলার কাছে কবুল হয়ে গেল। আল্লাহতাআলা তার প্রতি রাজি-খুশি হয়ে গেলেন এবং তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে তাকে জান্নাত দান করলেন।
নবীজি (সা.) এ ঘটনা বর্ণনা করলে সাহাবায়ে কেরামের আশ্চর্যবোধ হলো যে, একটা কুকুরকে পানি পান করানোর এত ফজিলত! কৌতূহলবশে তারা নবীজি (সা.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেসই করে ফেললেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাজা কলিজাবিশিষ্ট অর্থাৎ জীবিত যেকোনো প্রাণীর সেবাযত্ন করলে আল্লাহতাআলা খুশি হন এবং তিনি সেবাযত্নকারীকে পুরস্কৃত করেন। (বুখারি, হাদিস : ৬০০৯, মুসলিম, হাদিস: ২২৪৪)
বুখারি ও মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় আছে, ‘একটি কুকুর এক কুয়ার চারপাশে ঘুরছিল। পিপাসায় সেটি মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এ অবস্থায় বনি ইসরাঈলের এক চরিত্রহীনা নারী সেটিকে দেখতে পেল। তারপর সে নিজ মোজা খুলে তাতে তার জন্য পানি নিল। তারপর সেটিকে পান করাল। এর বদৌলতে তার মাগফিরাত হয়ে যায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪৬৭, মুসলিম, হাদিস : ২২৪৫) লক্ষণীয় বিষয় হলো, মহিলাটি ব্যভিচার দ্বারা উপার্জন করত। একটা কঠিন পাপকর্মকে সে পেশা বানিয়ে নিয়েছিল। তাহলে কত পাপ তার আমলনামায় জমা হয়েছিল? তা সত্ত্বেও সে যখন একটা জীবের প্রতি দয়া দেখাল, তখন আল্লাহতাআলাও তার প্রতি দয়া করলেন এবং তার গুরুতর পাপগুলো ক্ষমা করে দিলেন।
বুখারি ও মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, ‘এক নারী একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবার ও পানি দেয়নি, আবার তাকে ছেড়েও দেয়নি যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ফলে বিড়ালটি মারা যায়। এ কারণে সেই নারী জাহান্নামে প্রবেশ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪৮২ , মুসলিম, হাদিস : ২২৪২)
এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহতাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও নিষ্ঠুরতার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।
অতএব, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের অন্তরকে দয়া, মমতা ও সহানুভূতিতে পরিপূর্ণ করা। মানুষের কল্যাণে কাজ করা, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, প্রতিবেশীর হক আদায় করা, অসুস্থদের সেবা করা এবং সব জীবের প্রতি কোমল আচরণ করা। কারণ সৃষ্টির প্রতি দয়া করা মূলত স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনেরই একটি মহৎ মাধ্যম।
আল্লাহতাআলা আমাদের অন্তরে দয়া ও মানবতার গুণ সৃষ্টি করুন, তাঁর সমস্ত সৃষ্টির প্রতি সদয় হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামী, ঢাকা




