অশ্রুর ওপারে আল্লাহর রহমত

প্রতীকী ছবি
মানুষ ভুল করে। কখনো প্রবৃত্তির টানে, কখনো অজ্ঞতার অন্ধকারে, কখনো জীবনের কোনো দুর্বল মুহূর্তে। মানুষ হওয়ার অর্থই যেন হোঁচট খাওয়া এবং আবার উঠে দাঁড়ানো। তাই ভুল মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়; বরং ভুলের পর সে কোন পথে ফিরে আসে, সেটিই তার প্রকৃত পরিচয়। যে হৃদয় নিজের অপরাধে কেঁপে ওঠে, যে চোখ অনুতাপের অশ্রুতে ভিজে যায় এবং যে আত্মা নীরবে বলে ওঠে, ‘হে আমার রব, আমি ফিরে এসেছি’, সেখানেই তওবার সৌন্দর্য জন্ম নেয়।
আল্লাহর দরজা এমন কোনো দরজা নয়, যেখানে একবার ফিরে গেলে আর প্রবেশের সুযোগ থাকে না। মানুষের জন্য তাঁর রহমতের দরজা সব সময় খোলা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩) পাপের ভারে নুয়ে পড়া মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় আশার বাণী আর কী হতে পারে! মানুষ যত দূরেই সরে যাক, আন্তরিকভাবে ফিরে এলে তার জন্য ক্ষমার পথ উন্মুক্ত।
মানবজাতির ইতিহাসে তওবার প্রথম শিক্ষাটিও এসেছে আদম (আ.)-এর জীবনের মধ্য দিয়ে। নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার পর তিনি নিজের ভুলের দায় এড়িয়ে যাননি। বরং নিজের ওপরই জুলুমের কথা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত : ২৩) এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই তওবার সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা লুকিয়ে আছে: ভুলের পর অজুহাত নয়, ফিরে আসতে হয়।
তাই তওবা শুধু মুখে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণের নাম নয়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা তার সূচনা হতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের তওবা মানুষের ভেতর পরিবর্তন আনে। ইমাম নববী (রহ.) তওবার মূল শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন পাপ থেকে বিরত হওয়া, অতীতের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প। অন্য মানুষের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়াও তওবার অপরিহার্য অংশ। অর্থাৎ তওবা শুধু চোখের পানি নয়, চরিত্র ও জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার নাম।
আর এই ফিরে আসার প্রতিদান কত গভীর, তা আল্লাহ নিজেই জানিয়ে বলেছেন: ‘তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন।’ (সুরা ফুরকান,েআয়াত : ৭০) যে পাপ একদিন মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল, আন্তরিক তওবার পর সেই অভিজ্ঞতাই তাকে আরও বিনয়ী, সতর্ক ও আল্লাহমুখী করে তুলতে পারে।
তওবার সৌন্দর্য এখানেই শেষ নয়। আল্লাহ শুধু তওবাকারীকে ক্ষমা করার পাশাপাশি ভালোওবাসেন। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া বাহন ফিরে পেলে একজন মানুষ যেমন আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। (মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)
এই কারণেই তওবা কোনো অপমানের বিষয় নয়। বরং নিজের ভুল স্বীকার করে স্রষ্টার দিকে ফিরে আসাই মুমিনের শক্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন, ‘হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে একশবার তওবা করি।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৭০২) তাই তওবা শুধু পাপীদের জন্য নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্যপ্রত্যাশী মানুষের প্রতিদিনের আত্মশুদ্ধির অনুশীলন।
আল্লাহর রহমতের ব্যাপ্তি বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাঁর রহমতকে একশ ভাগ করেছেন। তার এক ভাগ পৃথিবীতে নাজিল করেছেন, যার কারণে মানুষ ও প্রাণী পরস্পরের প্রতি দয়া করে; আর নিরানব্বই ভাগ তিনি কিয়ামতের দিনের জন্য রেখে দিয়েছেন। (মুসলিম, হাদিস: ২৭৫৩) এমন দয়াময় রবের কাছে ফিরে আসতে তাই লজ্জা নয়, বরং ফিরে না আসাটাই মানুষের জন্য বড় ক্ষতি।
তওবার সত্যিকারের সৌন্দর্য অশ্রুতে নয়, পরিবর্তনে। যে চোখ কাঁদে, কিন্তু জীবন বদলায় না, তার তওবা অসম্পূর্ণই থেকৈ যায়। আর যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে অন্যায় ছেড়ে দেয়, মানুষের হক ফিরিয়ে দেয়, সৎকর্মে ফিরে আসে এবং আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে নতুন করে গড়ে, তার তওবাই জীবন্ত তওবা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তওবা করে, সে এমন, যেন সে কোনো গুনাহই করেনি।’ (ইবন মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০)
জীবনের পথে মানুষ হোঁচট খাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি পতন শেষ পতন নয়। কখনো কখনো একটি ভুলই মানুষকে নিজের দুর্বলতা চিনতে শেখায়, অহংকার ভাঙে এবং রবের দরজায় ফিরিয়ে আনে। তাই ভুল আমাদের অপূর্ণতার কথা বলে, আর তওবা আমাদের পূর্ণতার পথে ফিরিয়ে নেয়।
মানুষের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়তো সেই মুহূর্তই, যখন সে পৃথিবীর সব দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে একান্ত বিনয়ে আল্লাহর দরজায় দাঁড়ায়। চোখে থাকে অশ্রু, হৃদয়ে অনুতাপ, আর ঠোঁটে থাকে ক্ষমার প্রার্থনা। সেই ফিরে আসার নামই তওবা। আর সেই তওবার ওপারেই অপেক্ষা করে আল্লাহর সীমাহীন রহমত।



