মানুষের দোষ গোপন রাখার মর্যাদা

প্রতীকী ছবি
মানুষ মাত্রই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। কারও জীবনে এমন কিছু দুর্বলতা বা ভুল থাকতে পারে, যা প্রকাশ পেলে সে সামাজিকভাবে বিব্রত হয় কিংবা তার সম্মানহানি ঘটে। এ অবস্থায় একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো অন্যের দোষ প্রচার করে তাকে অপদস্থ করা নয়; বরং সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং যথাসম্ভব তার সম্মান রক্ষা করা। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যের দোষ গোপন রাখার প্রতিদান সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণী রয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ
‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
এই হাদিসে অন্যের দোষ গোপন রাখার বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। কারও ব্যক্তিগত ভুল জেনে তা মানুষের কাছে প্রচার করা, তাকে অপমান করা কিংবা তার দুর্বলতাকে উপহাসের বিষয় বানানো ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী। বরং কেউ ভুল করলে তাকে একান্তে বুঝিয়ে বলা এবং সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উত্তম আচরণ। এতে ব্যক্তির সম্মান রক্ষা পায় এবং সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা সহজ হয়ে গেছে। কারও ব্যক্তিগত কথোপকথন, বিব্রতকর ছবি কিংবা ভুলের ঘটনা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় মানুষ যাচাই না করেই এসব তথ্য প্রচার করে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মান ও সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, অপ্রয়োজনে অন্যের দোষ অনুসন্ধান ও প্রচার না করে নিজের সংশোধনের প্রতি মনোযোগী হওয়া। কোনো তথ্য সত্য হলেও তা প্রকাশ করা সব সময় ন্যায়সংগত হয় না।
তবে অন্যের দোষ গোপন রাখার অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। কেউ যদি অপরাধ করে, অন্যের অধিকার নষ্ট করে কিংবা কারও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ক্ষতি প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন হতে পারে। নির্যাতিত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়া কিংবা অপরাধের শিকার কাউকে ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করা জরুরি। তাই দোষ গোপন রাখার নীতি প্রয়োগ করতে হবে প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও ক্ষমাশীলতা প্রদর্শন করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মানুষকে তার ভুলের কারণে হেয় না করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। আমরা যদি অন্যের সম্মান রক্ষা করি এবং অযথা তার দোষ প্রকাশ না করি, তাহলে সমাজে সৌহার্দ্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে হাদিসে বর্ণিত প্রতিদানের আশাও আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। কারণ, অন্যের দোষ গোপন রাখার বিনিময়ে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের দোষ গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



