মানবজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই রয়েছে আমানতের পরীক্ষা

ইসলামি জীবনদর্শনে ‘আমানত’ ব্যাপক অর্থবোধক একটি শব্দ। অন্যের সম্পদ গচ্ছিত রাখা, মানুষের জীবন, মেধা, সময়, ক্ষমতা এবং নিজের অস্তিত্বও আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি আমানত। সৃষ্টির শুরুতে রুহের জগতে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের যে গুরুভার গ্রহণ করেছিল, দুনিয়ার জীবনে তার প্রতিটি পদক্ষেপে সেই আমানত রক্ষার পরীক্ষা চলছে। তাই আমানত রক্ষা যেমন ঈমানের পূর্ণতার প্রতীক, তেমনি খেয়ানত করা মুনাফেকির লক্ষণ।
সৃষ্টির সুচনায় আল্লাহ তাআলা যখন আসমান, জমিন ও পাহাড়কে আমানত বহনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তারা ভয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু মানুষ সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আসমান, জমিন ও পাহাড়ের কাছে এই আমানত পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং ভীত হলো; অথচ মানুষ তা বহন করল।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৭২)। এই আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রতিটি শ্বাস এবং প্রতিটি সুযোগ এক একটি বড় দায়িত্ব।
কর্মজীবী যখন তার কর্মঘণ্টায় ফাঁকি দেন, কিংবা একজন নীতিনির্ধারক যখন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্যকে সুযোগ দেন, তখন তিনি আল্লাহর দেওয়া আমানতের খেয়ানত করেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট হয়? তিনি বললেন, ‘যখন কোনো কাজের দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৪৯৬)। এটি রাষ্ট্র ও সমাজ ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ।
মানুষের চোখ, কান, হাত এবং অন্তরও আমানতের অন্তর্ভুক্ত। পরকালে এই অঙ্গগুলোই সাক্ষ্য দেবে সে এগুলোকে কোন পথে ব্যবহার করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর; এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)। নিজের শরীরকে ক্ষতিকর কাজে (যেমন মাদক বা পাপাচার) ব্যবহার করাও আমানতের খেয়ানত। কারণ এই শরীরের মালিক মানুষ নিজে নয়, মহান আল্লাহ।
কারও ব্যক্তিগত কথা বা কারও ত্রুটি গোপন রাখাও আমানতদারির অংশ। মজলিসের আলোচনা আমানত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কথা বলে এদিক-ওদিক তাকায় (অর্থাৎ সে চায় না অন্য কেউ শুনুক), তবে তার সেই কথাটি আমানত হিসেবে গণ্য।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৯)। সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধে এই আমানত রক্ষা করা অপরিহার্য।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মহীয়সী ব্যক্তিত্বরা আমানত রক্ষায় কতটা তটস্থ থাকতেন। খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) যখন ব্যক্তিগত কোনো কাজ করতেন, তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকায় কেনা প্রদীপটি নিভিয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রদীপ জ্বালাতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের এক ফোঁটা তেলও নিজের ব্যক্তিগত কাজে খরচ করা আমানতের খেয়ানত।
চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) যখন খিলাফতের দায়িত্ব পান, তখন তিনি নিজের তরবারিটি বাজারে বিক্রি করতে এনেছিলেন সংসারের খরচ মেটাতে। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমার রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকত, তবে আমি এই আমানত (যুদ্ধাস্ত্র) বিক্রি করতাম না।’ ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সম্পদের প্রতি এই নিরাসক্তি ও আমানতদারি কেবল ইসলামের গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব।
আমরা যদি বিশ্বাস করি যে আমাদের জীবন ও কর্মের প্রতিটি বিন্দু আল্লাহর কাছে গচ্ছিত আমানত, তবে সমাজ থেকে দুর্নীতি, অবিচার ও দায়িত্বহীনতা বিদায় নেবে। নিজের রুহের কাছে পরিষ্কার থাকাই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

