সভাপতির অবর্তমানে কে, কী আছে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে?

শেখ হাসিনার এক সাক্ষাৎকারের পর আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। একে তো দেশে কার্যক্রম চালানোর ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে সভাপতি শেখ হাসিনা রয়েছেন বিদেশে। তাহলে কে চালাবেন দলটি?
উত্তরটি সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই দিয়েছেন ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। তাতে এসেছে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম।
প্রশ্ন আসছে, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে এনিয়ে কী আছে?
দলটির গঠনতন্ত্রে লেখা আছে, সভাপতিই হবেন দলের প্রধান। তিনি দলের কাউন্সিল, জাতীয় কমিটির সব অধিবেশন, কার্যনির্বাহী সংসদ ও সভাপতিমণ্ডলীর সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
গঠনতন্ত্রের যেকোনো ধারা ব্যাখ্যা করার অধিকারও রয়েছে সভাপতির। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের মনোনয়নও দেবেন তিনিই।
সভাপতির অবর্তমানে কে সেই দায়িত্ব পালন করবেন, তাও ঠিক করবেন তিনিই। গঠনতন্ত্রে লেখা আছে, ‘সভাপতি তাহার অনুপস্থিতকালের জন্য সভাপতিমণ্ডলীর যেকোনো সদস্যকে সভাপতির কার্য সম্পাদনের জন্য দায়িত্ব প্রদান করবেন।’
অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কে হবেন, সে বিষয়ে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে গঠনতন্ত্র অনুসারে শর্ত থাকছে যে, তাকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হতে হবে।
যদি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতে চোখ রাখা যায়, তাহলে নাম পাওয়া যাচ্ছে— সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফর উল্লাহ, সাহারা খাতুন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, রমেশ চন্দ্র সেন, আব্দুল মান্নান খান ও আব্দুল মতিন খসরুর।
এর মধ্যে সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, নাসিম, সাহারা খাতুন, মোশাররফ, সৈয়দ আশরাফুল, রমেশ চন্দ্র সেন, মান্নান খান, পীযূষ কান্তি, মতিন খসরু মারা যাওয়ায় তাদের পদে আসার সুযোগ নেই।
তাহলে বাকি যারা থাকছেন, তাদের মধ্যে শেখ সেলিমের নামই রয়েছে সবার আগে। তিনি শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই।
টেলিফোনে দ্য ওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তার বোন শেখ রেহানার রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রে তার অবর্তমানে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে শেখ সেলিম দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র অনুসরণের কথা শেখ হাসিনা বলেন। আর গঠনতন্ত্রে অবশ্য সভাপতিমণ্ডলীর যেকোনো সদস্যকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার এখতিয়ার তাকে দেওয়া হয়েছে।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে যারা জীবিত রয়েছেন, তাদের কেউই এখন দেশে নেই। শেখ সেলিমও বিদেশে পালিয়ে আছেন।
বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য হলেও শেখ সেলিমকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ আগে থেকেই ছিল। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবে বর্তমান বিএনপি সরকারের অন্তত দুজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছে শেখ সেলিমের আত্মীয়তার সম্পর্ক। বিদ্যুৎ, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তার বেয়াই। শেখ সেলিমের ছোট ছেলে শেখ ফজলে নাইম বিয়ে করেছেন বিএনপি নেতা ইকবাল হাসানের মেয়েকে। বড় ছেলে শেখ ফজলে ফাহিমের স্ত্রী হলেন বর্তমান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বোন।
২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ এখন বড় দুঃসময় পার করছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ রয়েছে।
দলের শীর্ষনেতাদের অধিকাংশ বিদেশে পালিয়ে আছেন। যারা দেশে ছিলেন, তাদের বেশিরভাগই গ্রেপ্তার হয়ে রয়েছেন কারাগারে। আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সব সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
এমন প্রতিকূল এই অবস্থার মধ্যেই আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের আলোচনা শুরু হলো। তার মধ্যে শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দেওয়ার বার্তা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে দলের ভেতরে ও মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ, হতাশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
বিতর্কিত শেখ সেলিমকে সামনে আনতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পরিবারকেন্দ্রিক মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেক নেতা-কর্মী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেছেন, ‘রাজনীতি করে আর লাভ কী। দিনশেষে পরিবারই আসল।’
তবে সমালোচনা যতই থাকুক, এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগে সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। অন্তত গঠনতন্ত্র তাকে সেই ক্ষমতাই দিয়ে রেখেছে।







