দেশে ফেরার ছক কষছেন ভারতে নির্বাসিত আ.লীগ নেতারা

ফাইল ছবি
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও ভারতে আশ্রয় নেন। এখনো তারা ভারতেই অবস্থান করছেন।সেখানে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও রক্ষা করছেন তারা।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত দেশে ফেরার ছক কষছেন ভারতে অবস্থান নেওয়া দলটির শীর্ষ নেতাকর্মীরা।
দ্য গার্ডিয়ানে হান্নান ইলিয়াস পিটারসনের করা বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়— মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। কার্যক্রমে নিষিদ্ধ দলটি। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির নেতৃত্ব, স্থানীয় নেতারা প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের কলকাতার শপিং মলের ভিড়ঠাসা ফুডকোর্টে, কালো কফি আর ভারতীয় ফাস্টফুডের আড্ডায় বসে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন। ভাবছেন, কী করে, কোন উপায়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করা যায়। জুলাই আন্দোলনের সময় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা গণভবনের দিকে এগোতে থাকলে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে ভারত চলে যান। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নে প্রায় ১, ৪০০ মানুষ নিহত হন।
গণঅভ্যুত্থানের পর সহিংসতা ও ক্রমবর্ধমান মামলার মুখে আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মী দেশ ছাড়েন। শাসনামলের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেকেই জনরোষ ও আইনি ঝুঁকিতে পড়েন। তাদের মধ্যে ৬০০ জনের বেশি আওয়ামী লীগ নেতা কলকাতায় আশ্রয় নেন, যেখানে তারা তখন থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।
তবে, দলীয় কার্যক্রম ও সংগঠন টিকিয়ে রাখতে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের মে মাসে জনরোষের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম স্থগিত করে এবং হত্যা ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে। গত বছরের শেষদিকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন।
এরপর থেকে অনেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ বললেও মানতে নারাজ হাসিনা। এটিকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন। বরং ভারত থেকেই প্রকাশ্যে তার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে হাজারো সমর্থককে সক্রিয় করার চেষ্টাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় গোপন অবস্থান থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তার এই রাজনৈতিক তৎপরতা ভারত সরকারের নজরদারির মধ্যেই চলছে।
গত এক বছরে কলকাতা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্য। তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে থাকা আমাদের কর্মী, নেতা ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন শেখ হাসিনা । তিনি দলকে আসন্ন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কখনো কখনো তিনি দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা কল ও বৈঠকে থাকেন। আমাদের নেত্রী খুবই আশাবাদী যে, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি শেখ হাসিনা একজন নায়ক হিসেবেই ফিরবেন।’
ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম বলেন, ‘আমরা কলকাতায় আছি কারাগারের ভয়ে নয়, আমরা এখানে আছি, কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।’
শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দুটি নির্বাচন ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের মধ্যে দেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবি ভেঙে পড়ে।
শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের বলেছি, এই ভুয়া নির্বাচনে অংশ নেবে না, প্রচারণা করবে না, ভোট দেবে না।’
কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতকে ক্রমেই বিব্রতকর প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়ার বিষয়টি এবং আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতারা সবাই বলেছেন, ভারত তাদের দেশে ফেরত পাঠাবে—এমন আশা তাদের নেই।
গত সপ্তাহে এই ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। তার গোপন আশ্রয়স্থল থেকে ধারণ করা অডিও বার্তায়, তিনি আসন্ন নির্বাচনকে নিন্দা জানান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল’ ও বাংলাদেশকে ‘রক্তে ভেজা দেশে’ পরিণত করার অভিযোগ তোলেন।
প্রতিবাদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ দেওয়া এবং গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা।’তবে ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
জুলাই আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না। এটা ছিল আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার জন্য একটি সন্ত্রাসী দখল।’

