বিনামূল্যের কাজে এগিয়ে নারী, পিছিয়ে উপার্জনে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক চুলোয় ফুটছে দিনের প্রথম চায়ের জল, অন্য চুলোয় সেঁকা হচ্ছে রুটি। এরই মধ্যে দৌড়ে গিয়ে সন্তানকে স্কুলের পোশাক পরিয়ে দিচ্ছেন, সাদা ফিতে বাঁধছেন চুলে। হটপটে স্বামীর দুপুরের খাবার ভরতে ভরতেই ডাইনিং টেবিল থেকে হাঁক এলো, ‘কই হলো? অফিসের দেরি হয়ে যাবে তো!’ সঙ্গে সঙ্গেই ভোজবাজির মতো উদয় হলেন তিনি। স্বামী-সন্তানের প্লেটে বেড়ে দিলেন খাবার, কাপের চায়ে মেশালেন চিনি।
এভাবে দ্রুত হাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যিনি সংসারের চাকা ঘোরান, তিনি একজন নারী। একজন গৃহিণীকে গোটা দিনে কত ধরনের কাজ করতে হয়, তার কোনো হিসাব নেই। আর ‘নিজের সংসারের’ এসব কাজ তাকে করতে হয় বিনামূল্যে। যেহেতু জুতো সেলাই থেকে শুরু করে চণ্ডীপাঠ, সবই তিনি করছেন বিনা পারিশ্রমিকে, তাই এ কাজের কোনো অর্থনৈতিক মূল্য নেই। এমনকি ওই নারী যদি কর্মজীবীও হন, তাহলেও অফিসের কাজ শেষে ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়। কারণ ওই যে, নিজের সংসার।
দিন শেষে নারী অনেক বেশি কাজ করলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ কম হওয়ায় অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে আছেন নারীরা।
নারীশ্রমে এই চরম বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ( বিবিএস) বিভিন্ন জরিপে।
বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি প্রকল্পের পরিচালক ড. দীপঙ্কর রায়ের সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের।
তিনি বলছিলেন, ‘বিবিএস শুধু তথ্য দেয় কিন্তু তার বিশ্লেষণ করে না। তবে এ ক্ষেত্রে সাধারণত যেটি দেখা যায় সেটি হলো, আমাদের নারীরা পরিবারের বোঝা বইতে গিয়ে বাইরে কাজ করতে পারেন না। এ ছাড়া সংসারের ঘানি টানতে টানতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অর্থনৈতিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন না।’
যদিও খুব ধীরে হলেও পরিবর্তন হচ্ছে এ পরিস্থিতির, যোগ করলেন তিনি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিবিএসের হাউজহোল্ড স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টস শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে নারীরা যে অবদান রাখেন তার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় বছরে ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশের নারীরা গৃহস্থালি ও যত্নমূলক কাজে মোট সময়ের মধ্যে ব্যয় করেন ৮৮ শতাংশ বা ২ হাজার ১৪৬ ঘণ্টা। বাকি যে সময়টুকু থাকে তা ব্যয় করেন পুরুষরা।
প্রতিবেদন বলছে, নারীরা গড়ে পুরুষের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি বিনামূল্যের কাজ করেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক শুমারি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে আয়ের বৈষম্যের কথা। সেখানে দেখানো হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে নিয়োজিত রয়েছেন মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার ৯২৩ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ২ কোটি ৫৫ লাখ ১১ হাজার ৬৫২ বা ৮৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে নারী নিয়োজিত আছেন ৫১ লাখ ১৯ হাজার ২৭১ জন বা ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় উৎপাদন খাত থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, মটরযান ও মোটরসাইকেল মেরামত, পরিবহন ও গুদামজাতকরণ এবং শিক্ষাসহ প্রায় সব খাতেই পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে আছেন।
অর্থাৎ, একজন নারী ঘুম থেকে ওঠার পর ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত যত কাজই করুন না কেন তা কোথাও যুক্ত হচ্ছে না। ফলে পরিবার থেকেই শুরু হচ্ছে নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য। কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে, কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলস্রোতে আরও বেশি নারীকে নিয়োজিত করা না গেলে, এই বৈষম্য বেড়েই যাবে। আর নারীও বিপুল পরিশ্রম করেও পাবেন না তার স্বীকৃতি।
তবে শ্রম খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে চাইলে শ্রম আইন অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে অনুস্বাক্ষর করা আইএলও কনভেনশন ১৫৫, ১৮৭ ও ১৯০ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। যে সব কনভেনশনের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে শ্রমিকের পেশাগত নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মানোন্নয়ন এবং প্রতিরোধ হবে সহিংসতা ও হয়রানি।



