গৃহকর্মীর মে দিবস
নীতি থেকে আইনেই এক দশক, বাস্তবায়ন কত দিনে?
- অধিকার জানেন না অধিকাংশ গৃহকর্মী
- ২০-৪০ লাখ গৃহকর্মী, নেই নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ
- আইন হলেও নেই বিধিমালা ও বাস্তবায়নের পথ
- মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোরের আলো ফোটার আগেই দিন শুরু হয়েছে সালমার। ঘড়ির কাঁটা ৮টা ছোঁয়ার আগেই ঘর মোছা শেষ। ভিজিয়ে দিয়েছেন দুই বালতি কাপড়।
ক্যালেন্ডারে মে মাসের ১ তারিখ। দিনটি শ্রমিকদের অধিকার আর মর্যাদার কথা বলার। ড্রইংরুমে রাখা টেলিভিশন থেকে ভেসে আসছিল মে দিবসের মিছিল আর স্লোগানের শব্দ। সংবাদকর্মীরা গলা ফাটিয়ে মাইক্রোফোন হাতে বলে যাচ্ছেন শ্রমিকের জন্য আট ঘণ্টা কর্মদিবস বাস্তবায়নের কথা। সেদিকে একবার তাকান সালমা, তারপর আবার হাত ডুবিয়ে দেন বাসন ধোয়ার পানিতে।
এ বাড়ির কাজ শেষ করে ছুটতে হবে আরেক বাড়িতে। সকাল ৭টায় শুরু হওয়া তার ‘অফিস’ শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নামবে। আট ঘণ্টা কাজের হিসাব করলে তার পেট চলবে না। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই জীবনে, যত পরিশ্রম তত টাকা, সালমা শুধু এটুকুই বোঝেন।
শ্রমজীবী মানুষের জন্য যে এটি একটি বিশেষ দিন, তা কি জানেন সালমা?
খানিকটা হকচকিয়ে বললেন, ‘আমি তো কিছুই জানি না, আমাদের জন্য যে কিছু আছে সেইডা তো কেউ কখনো বলে নাই।’
বিশ্ব জুড়ে যখন শ্রমিক দিবস, শ্রমিকের অধিকার, কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টা নিয়ে নানা আলোচনা; তখন বাংলাদেশের গৃহকর্মীরা বাস করেন ভিন্ন বাস্তবতায়। জ্বর-সর্দিতেও থামানো যায় না যাদের কাজ। মাথাব্যথা, মাসিক ঋতুচক্র—এমনকি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ও যাদের রোজ কাজে যেতে হয়।
কোনো কারণে এক দিন কাজে না যেতে পারলে কেটে নেওয়া হয় বেতন, অনেক সময় বিনা নোটিসে বাদ দেওয়া হয় কাজ থেকে—যোগ করেন সালমা।
বাংলাদেশে সালমার মতো লাখো গৃহকর্মীর জীবন এমনই—নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, নেই ছুটির নিশ্চয়তা, অসুস্থ হলেও সুযোগ নেই কাজ বন্ধের। অথচ ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ প্রথমবারের মতো আংশিকভাবে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন গৃহকর্মীরা।
২০১৫ সালের ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ থাকলেও তা কার্যকর হয়নি আইন না হওয়ায়। এক দশক পর আইন হলেও এখনো দৃশ্যমান নয় এর বাস্তবায়ন কাঠামো। নামকাওয়াস্তে শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি মনিটরিং সেল থাকলেও এটি কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
তবে এই স্বীকৃতিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক বিশ্বজিৎ। তিনি বললেন, ‘আগে কোনো আইনগত স্বীকৃতি ছিল না, এখন অন্তত আইনের আওতায় এসেছে; এটা একটি ইতিবাচক দিক।’
একই সঙ্গে তুলে ধরলেন আইন বাস্তবায়নের জটিলতা। ‘শ্রম মন্ত্রণালয়, নাকি নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়—কে দায়িত্ব নেবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়’—উল্লেখ করলেন তিনি। তার মতে, বিধিমালা না থাকাও বড় বাধা। ‘যেকোনো আইন কার্যকর করতে হলে বিধিমালা লাগে। এখনো সেটি হয়নি, তাই বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেটি স্পষ্ট নয়।’
ঢাকার আরেক গৃহকর্মী শিউলি বললেন, ‘দিবস-টিবস বুঝি না আপা, কামে আসতে হয়। মে দিবসে বলে সবাই ছুটি পায়, কিন্তু আমাদের কাজ উল্টা বাড়ে। কারণ সরকারি ছুটি বলে যেসব বাসায় কাজ করি, সেখানে সবাই বাসায় থাকে। মেহমান আসে।’
শিউলির মতোই শহরের লাখো গৃহকর্মীর কাছে কোনো আলাদা অর্থ বহন করে না শ্রমিক দিবস। দিনটি তাদের জন্য আরেকটি নিয়মিত কাজের দিন।
এই গৃহকর্মীরা কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। নেই লিখিত চুক্তি, নেই নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো, বাদ পড়েছে সামাজিক সুরক্ষাও। কেউ এক বাসায় সার্বক্ষণিক, কেউ আবার একাধিক বাসায় ‘ছুটা’ কাজ করেন; কিন্তু পুরো ব্যবস্থায় অনুপস্থিত ন্যূনতম নিরাপত্তাও।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হাউজহোল্ড স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নের কাজের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ৭ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
এই বিশাল অবদানের বেশ বড় অংশই গৃহকর্মীদের শ্রম। তবু দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে ছিলেন তারা।
জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুর্শিদা আক্তার মনে করেন, আইন হলেও বাস্তব পরিবর্তন খুবই সীমিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইনে কর্মঘণ্টা, ন্যূনতম মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি বা মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো মৌলিক বিষয় নির্ধারণ করা হয়নি।
‘শুধু বলা হয়েছে আমরা শ্রমিক। কিন্তু বাস্তব সুরক্ষা কোথায়?’—প্রশ্ন রাখলেন তিনি।
একই সঙ্গে সচেতনতার ঘাটতির কথাও তুলে ধরলেন তিনি। প্রায় ৪০ লাখ গৃহকর্মীর বড় অংশই এখনো জানেন না নিজেদের অধিকার সম্পর্কে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদও আইনটিকে দেখছেন সীমিত অগ্রগতি হিসেবে। বললেন, ‘তারা সংগঠিত হতে পারবে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবে—কিন্তু এর বাইরে বড় কোনো অধিকার নিশ্চিত হয়নি।’
তার মতে, মে দিবসের চেতনার সঙ্গে বড় ফারাক রয়েছে এই বাস্তবতার। ‘ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ বা সামাজিক সুরক্ষা; এসব মৌলিক বিষয় এখনো আইনে স্পষ্ট নয়।’
তবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখছেন তিনি। ‘এই সুযোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য অধিকার আদায়ের পথ তৈরি করতে পারে’—বললেন সাইদ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার বনশ্রী মিত্র উল্লেখ করলেন, আইন থাকলেও তা এখনো অনেকটাই প্রতীকী। তার ভাষায়, ‘সুনির্দিষ্ট বিধিমালা ছাড়া আইন কার্যকর হয় না। কাজের সময়, মজুরি, ছুটি; এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে বাস্তবায়ন কঠিন।’
শুধু আইন নয়, বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট বিধিমালা, গৃহকর্মীদের নিবন্ধন ও জাতীয় ডেটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা ও হটলাইন চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরলেন বনশ্রী। ‘আংশিক স্বীকৃতিতে থেমে থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; পুরো ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলেই গৃহকর্মীরা প্রকৃত মর্যাদা ও সুরক্ষা পাবেন।’
দেশে গৃহকর্মীর সঠিক সংখ্যা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন হিসাবে ২০ থেকে ৪০ লাখ বলা হলেও নেই নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ। ‘এই খাত এতটাই অবহেলিত যে, এখনো সমন্বিত জরিপ তৈরি হয়নি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহকর্মীদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতেও। তাদের আয়, ব্যয় ও সঞ্চয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে সবকিছুই।
গৃহকর্মীদের প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছেন তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ও সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে পরামর্শ হিসেবে এলো টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন, পোস্টার বা প্রচারের মাধ্যমে আইনের বিষয়টি জানানো। পাশাপাশি আংশিক স্বীকৃতি নয়, গৃহকর্মীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করে সেটির যথাযথ বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলা হলো।
এক দশকের নীতি, আংশিক স্বীকৃতি আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পরও গৃহকর্মীদের জীবনে পরিবর্তন কতটা এসেছে—মে দিবসে সেটিই বড় প্রশ্ন।



