সরকারি চাকরিই কাল হচ্ছে মনিরার!
- বাছাইয়ে স্থগিত মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা
- জামায়াত জোটের অন্য ১২ মনোনয়ন বৈধ
- আইনের ফাঁকফোকর নয়, মানবিকতার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ মনিরার

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া সরকারি চাকরিই যেন কাল হতে বসেছে এনসিপি নেতা মনিরা শারমিনের। ছেড়ে দেওয়ার পরেও সেই চাকরির জন্য ফসকে যেতে চলেছে তার সাধের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ। মনিরার সংরক্ষিত নারী এমপি হওয়ার পথ আটকে গেছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) একটি ধারায়।
সরকারি চাকরি পেতে বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থেই প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়, কয়েক ধাপের পরীক্ষা পেরিয়ে তবেই পাওয়া যায় নিয়োগ। সেভাবেই ২০২৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে অফিসার (জেনারেল) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মনিরা। অবশ্য দীর্ঘদিন সেই চাকরি করেননি, রাজনীতি করার ইচ্ছা থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেন ইস্তফা।
অনেক রাজনীতিবিদের মতো মনিরারও নিশ্চয়ই স্বপ্ন ছিল একদিন এমপি হবেন। অবশেষে সেই সুযোগ যখন এলো, তখন জানা গেল এখনই তিনি পারবেন না এমপি হতে। সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় তার প্রার্থিতা পড়েছে অনিশ্চয়তায়।
আরপিও অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের তিন বছর পূর্ণ না হলে কেউ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। নির্বাচন কমিশন বলছে, এই বিধান সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
জামায়াত জোটের প্রার্থী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন কৃষি ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করেছেন মাত্র চার মাস আগে। আইনি শর্ত অনুযায়ী প্রার্থী হতে হলে চাকরি ছাড়ার পর কমপক্ষে পার হতে হয় ৩৬ মাস।
ফলে বুধবার (২২ এপ্রিল) ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় নির্বাচন কমিশন মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা ‘পেন্ডিং’ রাখে। তাকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।
বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইসির যুগ্ম সচিব মঈন উদ্দীন খান বলছিলেন, ‘১৩টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ১২টি বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একটি মনোনয়নপত্রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ।’
মনিরার জমা দেওয়া কাগজপত্রে সরকারি পে-স্কেলের কথা উল্লেখ থাকায় তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানালেন তিনি।
আসন উন্মুক্ত হওয়ার শঙ্কা
ইসি সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত জোট ১৩টি আসনের বিপরীতে ১৩ জন প্রার্থীর তালিকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে একজনের প্রার্থিতা ঝুলে থাকায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের পর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় এনসিপির আরেক প্রার্থী নুসরাত তাবাসসুমের আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মনিরার প্রার্থিতা বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট আসনটি হয়ে যাবে ‘উন্মুক্ত’।
সে ক্ষেত্রে নতুন করে ভোট হলে লাভবান হতে পারে ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট। বর্তমানে তাদের আসনসংখ্যা ৩৬, একটি আসন যুক্ত হলে তা বেড়ে হতে পারে ৩৭। বিপরীতে জামায়াত জোটের আসন ১৩ থেকে কমে ১২টিতে নামার রয়েছে আশঙ্কা।
তবে এনসিপি ও বিরোধী জোটের নেতাদের আশা, যেহেতু চাকরি স্থায়ী হওয়ার আগেই মনিরা পদত্যাগ করেছিলেন, তাই এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হয়তো বাতিল করা হবে না তার প্রার্থিতা।
জোট সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও বললেন, ‘মনোনয়নপত্র বাতিল হবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি।’
বিধান প্রযোজ্য নয়, দাবি মনিরার
কৃষি ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত হলেও একটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং তার পদটি রাষ্ট্রের কোনো লাভজনক পদ ছিল না জানিয়ে মনিরা বললেন, ‘এটি সরাসরি জনভোটের নির্বাচন নয়, বরং দলীয় মনোনয়নভিত্তিক— তাই বিধানটি আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’
তিনি একজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, কোনো নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা বা প্রশাসনিক প্রভাব তার ছিল না জানিয়ে মনিরা বলছিলেন, ‘উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তিন বছরের বিধান যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু আমার মতো একজন এন্ট্রি লেভেলের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ কতটা ন্যায়সংগত— সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।’
তার ভাষ্য, সংরক্ষিত নারী আসনের মূল উদ্দেশ্য নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো। কঠোর বা প্রাসঙ্গিকতা হারানো আইনি ব্যাখ্যার কারণে প্রার্থিতা বাতিল হলে ব্যাহত হতে পারে সেই উদ্দেশ্য। এতে অনেক যোগ্য নারী হারাতে পারেন রাজনীতিতে আসার আগ্রহ।
আইনের প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথা জানিয়ে মনিরা বললেন, ‘আইনকে সময়, বাস্তবতা ও ন্যায়বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আমি আইনের ফাঁকফোকর নয়, মানবিক ও বাস্তবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানাই।’
প্রার্থিতা বাতিল হলে আপিল করবেন বলেও জানালেন তিনি।
যাদের মনোনয়ন বৈধ
প্রথম দিনে যাচাই-বাছাই শেষে জামায়াত জোটের বাকি ১২ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, সাবিকুন নাহার মুন্নি, মারদিয়া মমতাজ, নাজমুন নাহার নীলু, মাহফুজা সিদ্দিকা, সাজেদা সামাদ ও সামসুন নাহার। এ ছাড়া শরিক দলগুলোর মধ্যে এনসিপির ডা. মাহমুদা আলম মিতু, জাগপার চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাহবুবা হাকিম এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম।
পরবর্তী ধাপ
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। যাচাই-বাছাই শেষ হবে ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। আপিল দায়েরের তারিখ ২৬ এপ্রিল, যা নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল।







