পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন
৩৪ বছরের সুসময়ে ফিরতে মরিয়া বামফ্রন্ট

সংগৃহীত ছবি
১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল, এই ৩৪ বছর একটানা পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে বামেরা। তবে ১৫ বছর আগে সেই বাম দূর্গ দখল করে নেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। তখন থেকেই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তৃণমূলকে সরাতে পারেনি কেউই। পক্ষান্তরে এক প্রকার বিলীন হয়ে গেছে বামেরা। সর্বশেষ নির্বাচনে মেলেনি একটি আসনও।
তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে উন্নয়নের ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে জনমানসে হারানো জমি পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে বামফ্রন্ট। রাজ্যের বাজেটের অন্তত ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে তারা জোর দিচ্ছে জনকল্যাণমুখী রাজনীতির ওপর।
বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির অঙ্গীকারকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে বামপন্থীরা। বর্তমানে কাজের সন্ধানে বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ ভিন্নরাজ্য হচ্ছেন। এই প্রবণতা বন্ধ করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাকেই অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে তারা।
পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি জনবহুল কৃষিপ্রধান রাজ্যে এখনো বহু মানুষ পরিশ্রুত পানীয় জল, বিদ্যুৎ ও ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বামফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জানিয়েছে, ক্ষমতায় এলে এসব মৌলিক সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে।
উল্লেখ্য, আগামীকাল ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় রাজ্যের ২৯৪টি আসনে অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যার এ রাজ্যে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি।
সিপিআই (এম), সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপিসহ বামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই জোটে এবার যুক্ত হয়েছে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন। টানা ৩৪ বছরের শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও ভূমিসংস্কারের যে সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাকেই সামনে রেখে ভোটারদের কাছে যাচ্ছে বামফ্রন্টের প্রার্থীরা।
বাম নেতাদের দাবি, তৃণমূল সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছে এবং একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। তাদের অভিযোগ, রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে বিভাজনমূলক রাজনীতি পরিচালিত হওয়ায় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে মানুষের জীবিকা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
রাজ্য সিপিআইয়ের (এম) সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানিয়েছেন, ‘বাংলা বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’—এই স্লোগান নিয়েই তারা নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য রক্ষায় বামপন্থীরাই কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
এবারের প্রার্থী তালিকায় তরুণদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকটে যুবসমাজের একটি বড় অংশ পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন তরুণ প্রার্থীরাও।
এছাড়া নারী নিরাপত্তা ও আরজি কর হাসপাতালের মতো নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগও জোরালোভাবে তুলে ধরছে বামফ্রন্ট। নির্বাচনকে ঘিরে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ার বিষয়েও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা। বামফ্রন্টের মতে, এটি দরিদ্র ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে জনগণের জীবন-জীবিকার প্রশ্নকে সামনে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে বামফ্রন্ট।




