‘লাইফলাইন’ ভাবছে নিষিদ্ধ আ.লীগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়— সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এমন বার্তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সে সুযোগকে সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ভেতরেও শুরু হয়েছে নীরব সমীকরণ। প্রকাশ্যে নয়, বরং আড়ালে থেকেই স্থানীয় নির্বাচনে ফেরার সম্ভাবনা যাচাই করছেন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। ব্যক্তিগত যোগ্যতায় নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই— সরকার ও ইসির পক্ষ থেকে এমন স্পষ্ট বার্তার পর স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে অংশ নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে আওয়ামী লীগ। দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রকাশ্যে কোনো দলীয় তৎপরতা না থাকলেও ভেতরে ভেতরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থানকে রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য একধরনের ‘লাইফলাইন’ বা নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও ধারণা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মাঠের রাজনীতিতে ফেরার একটি পথ তৈরি হতে পারে। সে কারণেই ইউনিয়ন পরিষদসহ নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি দলের হাইকমান্ড।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, সবচেয়ে তৃণমূলের নির্বাচন— ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন— হতে পারে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান পুনর্গঠনের সবচেয়ে কার্যকর সুযোগ। তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। অনেকে আত্মগোপনেও রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় নির্বাচনে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হলে নতুন করে রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন অন্তরালে থাকা নেতাকর্মীদেরও এলাকায় সক্রিয় হওয়ার
সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে দলটির ভেতরে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। একটি অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকায় বর্তমানে অনেক নেতাকর্মী নীরবে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করছেন। নির্বাচনে সক্রিয় হলে তারা আবারও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন। নতুন করে মামলা-হামলা কিংবা হয়রানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই আপাতত নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষেই মত দিচ্ছেন তারা। তবে এসব আশঙ্কার বিষয়ও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিবেচনায়
রাখছে বলে জানা গেছে।
দলটির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলোর দাবি, নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। ভার্চুয়াল বৈঠকগুলোতেও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি কয়েকবার আলোচনায় এসেছে। যদিও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু সম্ভাব্য অনেক প্রার্থী সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নীরবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। দল থেকেও তাদের এ ধরনের উদ্যোগে আপত্তি জানানো হচ্ছে না।
এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, জুলাই আন্দোলনের সময় যারা সরাসরি সংঘাতপূর্ণ বা মারমুখী ভূমিকায় ছিলেন না এবং যাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের মামলা নেই— এমন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা তুলনামূলক তরুণ নেতাকর্মীদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ জনপদে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে পারিবারিক প্রভাব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত পরিচিতি বেশি কার্যকর হওয়ায় সে বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, কোনো দলীয় স্লোগান, ব্যানার কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা স্থানীয় ‘নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর বিষয়েও ভাবনা চলছে।
তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সরকারের অবস্থানের ওপর। আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তাই সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে দলটির।




