গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক আপসহীন নেত্রী

বেগম খালেদা জিয়া—ফাইল ছবি
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মানবাধিকার এবং মানুষের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের দীর্ঘ সংগ্রামের ধারায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার নাম। সাধারণ পারিবারিক জীবন থেকে উঠে এসে তিনি যেভাবে বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের কাণ্ডারি হয়ে উঠেছেন, তা আধুনিক রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। স্বাধীন বাংলাদেশে বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা অনস্বীকার্য।
স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক ও ট্র্যাজিক প্রয়াণের পর যখন দেশ এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা, চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের প্রবল আকুলতা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সর্বসম্মত আহ্বানে রাজপথে পা রাখেন বেগম জিয়া। গৃহকোণের শান্ত ও সাধারণ পরিমণ্ডল ছেড়ে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির কঠিন অঙ্গনে অবতীর্ণ হওয়া তার জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। কিন্তু অদম্য সাহসিকতা, অটল দেশপ্রেম এবং জনগণের অধিকারের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা থেকে দেশের রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন তিনি। নানা ঝড়-ঝাপটা, প্রতিকূলতা ও ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিণত করেন কোটি কোটি মানুষের একক আস্থার প্রতীকে।
১৯৮০-র দশকের স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার রাজপথের আপসহীন সংগ্রাম দেশের মানুষকে এক নতুন গণতান্ত্রিক দিশা দেখায়। একটানা দীর্ঘ আট বছর চরম নির্যাতন, গৃহবন্দিত্ব ও প্রবল দমন-পীড়নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামকে এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেন। ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে তার অটল, অবিচল ও দূরদর্শী নেতৃত্বই বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এনে দেয় অভূতপূর্ব বিজয়। কোনো রাজনৈতিক আপস কিংবা প্রলোভনের কাছে কখনোই মাথানত না করার কারণেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর ১৯৯১ সালের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ও স্বতঃস্ফূর্ত রায়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। তার সফল শাসননামলে দেশে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটে। বিশেষ করে নারীশিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করা এবং মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রী উপবৃত্তি চালু করার মতো বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সারাদেশে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ অভিযানের মতো যুগান্তকারী সামাজিক কর্মসূচি তার সময়কালেই সফলতা পায়।
তবে রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সফল দায়িত্ব পালনের চেয়েও তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একজন অতন্দ্র প্রহরী। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার, অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্র রক্ষার জন্য তিনি জীবন বাজি রেখে কঠিন সংগ্রাম করেছেন। বারবার কারাবরণ, মিথ্যা মামলার ভয়াবহ চাপ, নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন এবং চরম ব্যক্তিগত বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতি থেকে সরে যাননি। সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নে এই অটল মনোভাবই তাকে যুগে যুগে দল-মত নির্বিশেষে দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে এক পরম শ্রদ্ধেয় ও অবিসংবাদিত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
আজ ১৫ আগস্ট, বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিনে অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা ও মমতার সঙ্গে স্মরণ করছি বেগম জিয়ার সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণমানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় তার কালজয়ী অবদানকে। জাতীয় রাজনীতিতে মতাদর্শিক ভিন্নতা কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক বিকাশ পর্যালোচনা করলে বেগম খালেদা জিয়ার নাম বাদ দিলে তা অসমাপ্তই থেকে যাবে। দেশ ও জাতির সেবায় তার আত্মত্যাগ ও অনমনীয় মানসিকতা ভবিষ্যতের যেকোনো রাজনৈতিক কর্মীর জন্যও প্রেরণার প্রধান উৎস হয়ে থাকবে।
এই শুভ দিনে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে সকাতরে প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়ার সারা জীবনের নেক আমল, ত্যাগ এবং দেশসেবামূলক কাজগুলোকে উত্তম ইবাদত হিসেবে কবুল ও মঞ্জুর করে নেন। তার সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি যেন আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় হয়, মানুষের অবাধ বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক নাগরিক অধিকার যেন চিরকাল সুরক্ষিত থাকে এবং আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবন থেকে হিংসা-সংঘাত দূর হয়ে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন শুভ সংস্কৃতি রূপ লাভ করে, এটাই আজকের দিনে সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
[email protected]









