মামলার ফাঁদে ‘হিমঘরে’ আধুনিক মর্গ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ভার সামলাতেই যখন স্বজনরা দিশাহারা, তখন মরদেহ নিয়ে শুরু হয় আরেক দফা ভোগান্তি। পাবনায় আধুনিক হিমঘর না থাকায় ময়নাতদন্তের আগে একের পর এক মরদেহ পড়ে থাকছে মেঝেতে, তীব্র গরমে নষ্ট হচ্ছে শেষবারের মতো প্রিয় মুখটি দেখার সুযোগ। অথচ এই সংকট দূর করতে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতায় থমকে আছে নির্মাণকাজ। কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কাটেনি জটিলতা। একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক, অন্যদিকে মরদেহ নিয়ে সীমাহীন ভোগান্তি— দুইয়ের ভারে ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা।
সম্প্রতি এক দিনেই ছয়টি মরদেহ আসে হাসপাতালে। কিন্তু হিমঘরে একসঙ্গে এত মরদেহ রাখার মতো জায়গা নেই। এক শয্যার হিমঘরে ধারণক্ষমতা না থাকায় কয়েকটি মরদেহ রাখতে হয় মেঝেতে। একটি মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় অন্যদের। তীব্র গরমের মধ্যে সেই অপেক্ষা আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন ছুরিকাঘাতে নিহত কলেজছাত্র মনিরুলের স্বজন রফিকুল ইসলাম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার খুন হয়েছে ছেলেটি। হাসপাতাল মর্গে একসঙ্গে একটির বেশি মরদেহ পোস্টমর্টেম করা যায় না। এজন্য সময়মতো মরদেহ পাচ্ছিলাম না।’
স্বজনদের এই দুর্ভোগের পেছনে শুধু মর্গের জায়গার সংকট নয়, রয়েছে মরদেহ সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থার অভাবও। পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. জাহিদুল ইসলামের ভাষ্য, ‘আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় মরদেহ সংরক্ষণ করা বেশ কষ্টসাধ্য। এই ভোগান্তি দূর করতেই হাসপাতাল চত্বরে আধুনিক মর্গ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।’
প্রকল্পের তথ্য বলছে, পাবনা জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণকাজ শুরু হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে ছয় মাস মেয়াদি প্রকল্পটির কাজও এগোচ্ছিল দ্রুতগতিতে। একপর্যায়ে নির্মাণকাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আপত্তি, মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতা।
ভবনের অবস্থান নিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষের আপত্তির কারণে বাধাগ্রস্ত হয় প্রকল্পের কাজ। আপত্তির মধ্যে ভবনটি ঘিরে বলা হয় বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কার কথাও। পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট দুই মাসের স্থগিতাদেশ দিলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শুরু হয়নি কাজ। আইনি জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা। এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদও। ফলে যে স্থাপনা চালু হওয়ার কথা ছিল কয়েক মাসের মধ্যে, সেটি এখন পড়ে আছে অসম্পূর্ণ অবস্থায়।
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম মনে করেন, আধুনিক মর্গ হলে শুধু মরদেহ সংরক্ষণের সমস্যাই কমত না, ময়নাতদন্তের কাজও আরও সুশৃঙ্খল ও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হতো। তার ভাষায়, ‘ভিসেরা রিপোর্ট বা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংগৃহীত আলামত নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করা যেত। ময়নাতদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডে-লাইট’ বা উপযুক্ত আলোর ব্যবস্থাসহ আধুনিক নানা সুবিধা থাকত। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের কাজ আরও সহজ ও নিখুঁত হতো।’
মরদেহ সংরক্ষণের এই সীমাবদ্ধতার কারণে পুলিশ প্রশাসনকেও প্রতিনিয়ত পড়তে হচ্ছে সমস্যায়। পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফের দাবি, প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই জেলায় বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে এবং অনেক মরদেহ সামলাতে হয় পুলিশকে। অথচ হাসপাতালে মরদেহ সংরক্ষণের জন্য নেই হিমঘর।
সংকট সামাল দিতে পুলিশ নিজেদের উদ্যোগে কিছু ব্যবস্থা করেছে। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, জেলার ১১টি থানার মধ্যে পাঁচটি থানায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছোট লাশঘর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দুই থেকে তিনটির বেশি মরদেহ রাখা সম্ভব নয়। ফলে মরদেহের সংখ্যা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, এই ভোগান্তির দ্রুত নিরসন জরুরি।
নির্মাণাধীন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা এবং নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে জেলা প্রশাসন বলছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি জানানো হবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে আধুনিক মর্গটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।






