মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হবেন রিজভী

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এটি এখন প্রায় নিশ্চিত। কারণ, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির তালিকায় ১ নম্বরে রয়েছে তার নাম।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির মনোনয়ন পেলে জাতীয় সংসদে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলই হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
এদিকে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা যতই স্পষ্ট হচ্ছে, ততই সামনে আসছে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন— সেই প্রশ্ন। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভী হবেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। পরে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে দলের নতুন মহাসচিব।
বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যান। এরপর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি।
পরে ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। সংকট-সংগ্রাম-নেতৃত্বে এক দশকের বেশি সময় ধরে ‘অতন্দ্রপ্রহরী’ হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। মির্জা ফখরুল বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দল ও সরকারে আনতে হবে একাধিক সাংগঠনিক পরিবর্তন। সেক্ষেত্রে তাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়তে হবে। পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব পদেও আনতে হবে নতুন নেতৃত্ব। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে শূন্য হবে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসনও। ফলে ওই আসনে প্রয়োজন হবে উপনির্বাচনের।
দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও চলতি বছরের ডিসেম্বর সামনে রেখে দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এই কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে নতুন মহাসচিব নির্বাচন করবে বিএনপি। কারণ, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হোন বা না হোন, শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সজনিত কারণে বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে আর আবার থাকতে চান না তিনি।
মির্জা ফখরুল নিজেও সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে, অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।’
তাহলে কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব? সেই প্রশ্নটি এখন উচ্চারিত হচ্ছে জোরালোভাবে। দলের অভ্যন্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির অষ্টম মহাসচিব হিসেবে মোটাদাগে আলোচনায় রয়েছেন তিনজন।
তারা হলেন— স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বর্তমান সরকারে তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব পালন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আর রুহুল কবির রিজভী মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার প্রভাব এবং তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি, তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রণয়নে ভূমিকা রেখে আসছেন।
তবে বিএনপির মধ্যে এমন আলোচনাও আছে যে, সালাহউদ্দিন আহমদ দলের মহাসচিব হলে স্বরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির মহাসচিব এবং স্বরাষ্ট্রের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটা মন্ত্রণালয়-একজনের পক্ষে এই দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা বেশ দুরূহ হবে। কারণ, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় দলের মহাসচিবকেই এখন সংগঠনে বেশি মনোযোগ ও সময় দিতে হবে।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করেন বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিভাগীয় সমাবেশ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সফলভাবে বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মাঠপর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসেবায় নিজেকে সদা নিয়োজিত রাখায় তিনি জিয়া পরিবারেরও বিশ্বস্ত সঙ্গী।
রুহুল কবির রিজভীকে দলের নেতাকর্মীরা ‘ত্যাগী নেতা’ হিসেবেই বেশি মূল্যায়ন করেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি, মামলা-হামলা মোকাবিলা এবং দলের দুঃসময়ে দৃঢ় অবস্থানের কারণে নেতাকর্মীদের কাছে তিনি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তবে রিজভী নির্বাচন করেননি, তাকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি।
তবে শেষ পর্যন্ত এই তিনজনের বাইরেও অন্য কোনো নেতার নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





