ষড়যন্ত্র তত্ত্ব : ফুটবলের মাঠ থেকে পোস্ট-ট্রুথের জগতে

লেখক ও চিত্রনাট্যকার শিবব্রত বর্মন
ভেবেছিলাম বিশ্বকাপ শেষ হলে ফুটবল ফ্যানদের বিচিত্র ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জাল বোনার বিরক্তিকর বাতিকের ইতি ঘটবে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখছি, এই প্রবণতা শেষ তো হয়নি, উল্টো এক পরিহাসময় দিকে মোড় নিয়েছে। এখন উল্টো আর্জেন্টাইন ফ্যানরা নতুন করে ফিফার ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছেন। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর যেন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এক নতুন বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে।
আমি সেগুলোর দিকে নজর না দিয়ে বরং ভিন্ন একটি বাস্তবতায় নজর দিতে চাই। আর তা হলো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একাধিপত্য। কেন এবার সকলে এমন গণহারে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করে বসে থাকলেন? কেন মাঠের খেলার আড়ালে ষড়যন্ত্রের সুদূর, গোপন জাল ছড়িয়ে থাকার কাহিনি আমাদের প্রায় সবার কাছে এত লোভনীয় বলে মনে হলো?
এ প্রশ্নের জবাব ফুটবলের মধ্যে নেই। কারণ ব্যাপারটা শুধু ফুটবলের ক্ষেত্রে ঘটছে না। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নাগরিক সমাজের চিন্তার কেন্দ্রে চলে এসেছে। আমরা যে কোনো ঘটনা এখন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতে আরাম পাই। সেটা কেবল রাজনীতি আর যুদ্ধের ক্ষেত্রে নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন, মহাকাশ অভিযান বা এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রেও। আমরা যেন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে কোনো বড় ঘটনা ঘটলে কেউ আর সবার আগে প্রশ্ন করে না, কী ঘটল? তারা জানতে চায়, এর পেছনে কে আছে? কে কলকাঠি নাড়ছে?
আমি আমার জীবনে প্রথম যে মেগা বা মহা-ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মুখোমুখি হয়েছিলাম, সেটা হলো: নিল আর্মস্ট্রংয়ের চন্দ্রাভিযান ভুয়া। এটা নাকি হলিউডের স্টুডিওতে শ্যুটিং করা। মহাকাশ দৌড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারাতে মরিয়া আমেরিকা নাটক সাজিয়েছে।
আমাদের প্রজন্মের কাছে দ্বিতীয় মহা-ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হলো টুইন টাওয়ারের পতন ইহুদিদের সাজানো। এরপর আমরা একে একে কোভিড মহামারির পিছনে টিকা উৎপাদনকারী ওষুধ কোম্পানিগুলোর কারসাজি দেখি, জলবায়ু সংকটের পিছনে দেখি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফেরি করা কোম্পানিগুলোর লম্বা হাত, ভূ-রাজনীতির অনেক ঘটনাকে আমরা এখন মাটির তলায় লুকানো রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট করায়ত্ব করার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখতে চাই।
এটা নিছক কোনো মনস্তাত্ত্বিক বা সামাজিক পরিবর্তন নয়। এ এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক রদবদল। আমরা বুদ্ধি ও চিন্তার যে প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে সত্যকে চিনি, যে বিশ্বাস ও মতামত গঠন করি – সেই প্রক্রিয়াটা বদলে যাচ্ছে।
একটা সময় বড় ঘটনাগুলোকে আমরা ব্যাখ্যা করতাম আসমানি শক্তির ইচ্ছা হিসেবে। তারপর একসময় জগতের সবকিছু ব্যাখ্যার ভার নিয়ে নিয়েছিলেন মার্ক্সবাদি চিন্তকেরা। এ দুটি চিন্তাধারা এখন ক্ষয়িষ্ণু। এখন ঘটনার সর্বব্যাপী ব্যাখ্যায় মানুষের আস্থা কমেছে। কোনো কেন্দ্র নাই।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চিরকালই ছিল। কিন্তু কখনও তা মূল ধারা ছিল না। ছিল বিকল্প ব্যাখ্যা বা তত্ত্ব। বন্ধুদের আড্ডায় এক কোণায় চা-বিড়ি ফুঁকতে থাকা অপুষ্ট ছেলেটি হয়ে বসে থাকত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। তাহলে এখন সেই ব্যাকবেঞ্চার ছেলেটি সামনের কাতারে এসে বসে আছে কী করে? কেন আড্ডার সবাই আমরা এমন উর্বর মগজধারী হয়ে উঠলাম?
আমার ধারণা এর পেছনে আছে এমন এক ঘটনা বা পরিস্থিতি যেটাকে আমরা নাম দিয়েছি পোস্ট-ট্রুথ। এটা এমন এক সময়, যখন মানুষের মতামত গঠনে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আবেগ এবং গোষ্ঠীগত পরিচয় বেশি প্রভাব বিস্তার করে। এখানে মানুষ তথ্য অস্বীকার করে না বটে, কিন্তু তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে একই ঘটনার একাধিক বাস্তবতা বা ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
এর পিছনে আছে তথ্যের আধিক্য আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপস্থিতি। আমাদেরকে এখন তথ্যের সমুদ্রে এমনভাবে হাবুডুবু খাওয়ানো হচ্ছে যে আমরা আর প্রথাসিদ্ধ মিডিয়ার ওপর নির্ভরতা হারিয়ে ফেলছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো যে, একটি সংযত বিশ্লেষণের চেয়ে ‘সবই স্ক্রিপ্টেড’, ‘সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল’—এ ধরনের বাক্য অনেক দ্রুত ছড়ায়। কারণ মানুষের মগজ নাটকীয় ব্যাখ্যা পছন্দ করে।
আমাদের মস্তিষ্ক নাকি কাকতালীয় ঘটনাকে সহজে মেনে নিতে পারে না। অপ্রত্যাশিত কোনো ফলাফলের চেয়ে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র আমাদের কাছে বেশি অর্থবহ মনে হয়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন প্যাটার্ন সিকিং, অর্থাৎ অর্থহীন ঘটনাতেও অর্থ খুঁজে পাওয়ার প্রবণতা। আরেকটি প্রবণতা হলো এজেন্সি ডিটেকশন বা প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো ইচ্ছাকৃত শক্তি কাজ করছে বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা।
এখানেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের খুঁটির জোর। এটা জটিল এই জগৎটাকে সহজ করে দেয়। অনেকগুলো স্তরীভূত কারণের বদলে একটিমাত্র গোপন কারণ হাজির করে। ইতিহাস, অর্থনীতি, কৌশল, মানবিক ভুল, সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে যে জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সেটিকে সংকুচিত করে একটিমাত্র বাক্যে নামিয়ে এনে বলে, সবই পরিকল্পিত।
এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীতে কখনো ষড়যন্ত্র ঘটে না। ইতিহাসে ওয়াটারগেট কেলেংকারি হয়েছে, করপোরেট গোপন চুক্তি হয়েছে, রাষ্ট্র গোপন অভিযান চালিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা গোপন মিশন নিয়ে মাঝরাতে অন্ধকার গলিপথে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। প্রকৃত ষড়যন্ত্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করা ভুল হবে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে ষড়যন্ত্রকে দাঁড় করানো হলো একপ্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা।
এ কারণে এবার বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যে অন্যরকম মাতামাতি হলো, সেটাকে আমি আমাদের সময়ের একটি আয়না হিসেবে দেখতে চাই। এ আয়না আমাদের বলছে, আমরা এমন এক যুগে, এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষ কাকতালীয় ঘটনা, অনিশ্চয়তা এবং মানবিক ভুলকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। প্রতিটি ঘটনার পেছনে আমরা একজন অদৃশ্য চিত্রনাট্যকারকে দেখতে পাচ্ছি।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রটা কোনো গোপন কক্ষে বসে লেখা হচ্ছে না। সেটা ঘটছে আমাদের মনের ভেতরে। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক মানসিক জগতে প্রবেশ করছি, যেখানে সত্যের চেয়ে সন্দেহ, প্রমাণের চেয়ে বিশ্বাস, আর বাস্তবতার চেয়ে বর্ণনা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান মঞ্চ।




