বেইজিং থেকে কী নিয়ে ফিরলেন ট্রাম্প?

মাহফুজুর রহমান
বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা যখন কোনো বিদেশ সফরে যান, তখন সঙ্গে বিশাল লটবহর থাকে। নিরাপত্তা কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের পাশাপাশি সফরে অনেক সময় বিশাল ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক প্রতিনিধিদলও যোগ দেয়।
সাংবাদিকদের নেওয়া হতো সরকারি খরচে, যেন তারা ফিরে এসে সরকারের গুণকীর্তন করতে পারেন। ব্যবসায়ীরা যেতেন নিজেদের পয়সায়; তারা আশা করতেন সফরের কোনো ফাঁকে সরকারপ্রধানের সুনজরে পড়বেন। ফলে বিদেশে না হলেও দেশে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন। অনেক ক্ষেত্রে দলে ঢুকতে ব্যবসায়ীরা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ উৎকোচও প্রদান করতেন। এসব ক্ষেত্রে হিসাব করা হতো সফরে লাভ-লোকসান কেমন হলো।
বাংলাদেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরে এমন ঘটনা ঘটে। ২০০৫ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী যখন ভারত সফর করেন, তখন তার সঙ্গে ছিল একশর বেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরে তার সঙ্গে ছিলেন চৌকস ধনকুবের ইলন মাস্ক এবং অ্যাপল, গোল্ডম্যান স্যাক্স, বোয়িং ও এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তারা।
ট্রাম্পের ভাষায়— এদের সবাই চীনকে সমীহ করে। টেসলা তো সাংহাইয়ে কারখানা বসিয়েছে, আর অ্যাপলের আইফোনের ৮০ ভাগই চীনে তৈরি হয়। ট্রাম্পের ট্যারিফ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এনভিডিয়াও চীনের উন্নত চিপ বাজারের ৯৫ ভাগ নিজেদের দখলে রেখেছিল।
বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা যখন দ্বিপাক্ষিক সফরে যান, তখন আশা থাকে তারা বেশ কিছু চুক্তি করবেন— যাতে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে, অথবা কেউ আমাদের প্রকল্প সাহায্য কিংবা শুল্ক সুবিধা দেয়। অর্থাৎ, আমরা কখনো কাউকে দিতে যাই না, সবসময় পেতে চাই।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এবারের চীন সফরটাও যেন তেমনই ছিল। কিছু দিতে নয়, বরং একপ্রকার হাত পাততেই গিয়েছিল ট্রাম্প বাহিনী। আশা ছিল অনেক। যেমন—ইরান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী ইরানকে নত করতে চীন সচেষ্ট হবে; তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে; আর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে চীন যাদের দীর্ঘমেয়াদে বন্দি করে রেখেছে, তাদের মুক্ত করে দেবে।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ট্রাম্পের জয়গান গাওয়ার জন্য সঙ্গে যায়নি, বরং তারা গিয়েছিল এটি নিশ্চিত করতে যেন ট্রাম্প বাণিজ্য আলোচনা থেকে দূরে সরে না যান। ধনকুবেরদের ব্যক্তিগত গোয়েন্দা থাকে, যারা সরকারি কর্তাব্যক্তি বা রাজনীতিকদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখে। ট্রাম্পের ওপর তাদের বিশ্বাস পাকাপোক্ত নয়; ট্রাম্পের কথায় ও কাজে যে মিল থাকে না— সে সন্দেহ তাদের বরাবরই আছে।
তাদের আশা ছিল— চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান কিনবে, রিপাবলিকান রাজ্যগুলো থেকে সয়াবিন, মুরগি ও গরুর মাংস কিনবে; এনভিডিয়া থেকে আবার চিপ কেনা শুরু করবে; যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহজ শর্তে দুর্লভ খনিজ বিক্রি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আবার চীনা বিনিয়োগ সহজতর হবে।
সমঝোতার নিয়ম হলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এমন এক জায়গায় পৌঁছানো, যাতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে কিছু ছাড় দেবে, বিনিময়ে ওই পক্ষ থেকেও নিজে এমন কিছু ছাড় পাবে— যেন দুই পক্ষই বলতে পারে যে সমঝোতায় তাদের জয় হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্ষেত্রে এমন সমঝোতায় পৌঁছানো বেশ কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি, সেখানে চীন শুধু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থানটি দখল করতে সচেষ্ট। ফলে এক ও দুই নম্বরের মধ্যে সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ও রেষারেষিই বেশি।
চীনের দিক থেকে প্রতিটি বৈশ্বিক ইস্যুতে স্পষ্ট পাল্টা অবস্থান রয়েছে। ইরান যুদ্ধ প্রশ্নে চীনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মনঃপূত নয়। যদিও চীন হরমুজ প্রণালি নির্বিঘ্ন করার পক্ষে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে; কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইরানকে একঘরে করার বিপক্ষে এবং ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে। তাইওয়ানের ব্যাপারেও চীন বরাবরই স্পষ্ট। মাও সেতুংয়ের সময়কাল থেকেই চীন তাইওয়ানকে তার সীমানাভুক্ত মনে করে।
দেং শিয়াওপিং কিছুটা বাস্তবমুখী হয়ে ‘এক দেশ, দুই নীতি’ গ্রহণ করেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগই চীন বরদাশত করবে না। তার মানে, যুক্তরাষ্ট্র অত সহজে তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবে না।
বোয়িং, সয়াবিন বা গরুর মাংস হয়তো চীন কিনতে পারে, কিন্তু তা কখনোই প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে হবে না। ২০০ বোয়িং কেনার সমঝোতা আগেই ছিল; ব্লুমবার্গ অনুমান করেছিল ৫০০ বোয়িং কেনার চুক্তি হবে। আগ্রহীরা তখন তড়িঘড়ি করে বোয়িংয়ের শেয়ার কেনা শুরু করেন। তবে সফরের পর সেরকম কোনো চুক্তি দেখতে না পাওয়ায় বোয়িংয়ের শেয়ারদরের পতন হয়েছে।
চীন জানে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়াও প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রে দুর্লভ খনিজের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়বে। সেজন্য চীন নিজের স্বার্থ রক্ষা করেই কেবল দুর্লভ খনিজ ছাড়বে। তার মানে, ওই খনিজ পেতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য ক্ষেত্রে বড় মাপের ছাড় দিতে হবে। এর অর্থ হলো, দুদেশের মধ্যে অত সহজে বড় ধরনের সমঝোতার সুযোগ খুব কম। তারপরও বাণিজ্য ক্ষেত্রে যদিবা কিছু অগ্রগতি হয়, political বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার জায়গাটি মনে হয় তার চেয়েও বেশি সংকুচিত।
এবারের বৈঠকে বিভিন্ন সূত্র থেকে যেটুকু জানা গেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নত ইলেকট্রনিক চিপ কিনতে আগে চীনের যত আগ্রহ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার কারণে চীন এখন সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ওইসব চিপ প্রধানত তাইওয়ানে তৈরি থাকায় চীন তাদের কৌশল বদলে ফেলেছে। এখন চীন বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য নিজেই উন্নত ইলেকট্রনিক চিপ তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। ফলে ট্রাম্পের নির্দেশে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী আলাস্কা থেকে উড়ে এলেও, চীনের অনাগ্রহ তাদের সবাইকে হতাশ করেছে।
শুধু উন্নত চিপই নয়, চীন বাণিজ্য-সম্পর্কিত কোনো ইস্যুতেই তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তবে দুই নেতা এ বছর আরও কয়েকবার মুখোমুখি হতে পারেন— সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে, নভেম্বরে শেনঝেনে এবং ডিসেম্বরে মিয়ামিতে। সুতরাং বেইজিং বৈঠকে যেসব বিষয় অমীমাংসিত থেকে গেছে, সেসব নিয়ে নিশ্চিতভাবেই বারবার আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
আমেরিকা একটি মাল্টিকালচারাল সোসাইটি। সেখানে বহু মত ও পথের মানুষ, বহু জাত ও ধর্মের মানুষ একই নীল-লাল পতাকার নিচে গণতন্ত্রের ছায়ায় সমানাধিকার নিয়ে কালচারাল মাল্টিপ্লিসিটির গান গায়। অন্যদিকে চীনে কমিউনিস্ট ধরনের শাসনব্যবস্থা; সেখানে পশ্চিমা উদারপন্থী গণতন্ত্র অনুপস্থিত, কোনো মাল্টিপার্টি সিস্টেম বা বহুদলীয় ব্যবস্থা নেই; এমনকি নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যও তেমন নেই।
অথচ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের এই লগ্নে ট্রাম্প যেখানে আমেরিকান সুপ্রিমেসি নিয়ে উন্নত নাক, সেখানে চীনই সিভিলাইজেশনাল প্লুরালিজমের চেতনাকে সামনে নিয়ে আসছে। তাই এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ মানুষ সম্ভবত এই কারণে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে শি-র দিকেই তাকিয়ে ছিল—এটি দেখার জন্য যে, শি জিনপিং কীভাবে উন্নত-নাক ট্রাম্পকে মাটির দিকে তাকাতে বাধ্য করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এই সফরেই সবচেয়ে বেশি সংযত আচরণ করেছেন; স্বভাবজাত কোনো পাগলামিই তিনি বেইজিংয়ে করেননি। যেন তিনি— ‘জাতে মাতাল, তালে ঠিক’। এতে অনুমান করা যায়, তার আপাত উদ্ভট আচরণ সম্ভবত তার একটি কর্মকৌশল মাত্র।
এসব আপাতবিরোধী অবস্থানের মধ্যেও মোটা দাগে যেটুকু বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে, তা কোথাও লিখিত আকারে স্বাক্ষরিত না হলেও বিশ্বব্যাপী কিছু স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। প্রথম মতৈক্য হলো, উভয়ই বিশ্বের শীর্ষ দুটি অর্থনৈতিক শক্তি এবং দুজনের অর্থনৈতিক ক্ষমতা এখন প্রায় কাছাকাছি। দ্বিতীয়ত, শুধু অর্থনৈতিক বিবেচনাতেই নয়, সামরিক শক্তিতেও চীন যথেষ্ট দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী উভয়েরই নিজস্ব রাজনৈতিক প্রভাববলয় রয়েছে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটি রাষ্ট্র হওয়ায়, তাদের নিজেদের মধ্যকার বৈঠক বিশ্বের স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি, উন্নয়ন— মোদ্দা কথা বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে যা নিয়ে মতৈক্য হয়নি, বিশ্ববাসী সেটুকু নিয়ে আশার সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকবে। দুটি দেশের মধ্যে শুধু বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ বা সমঝোতা নয়, বিশ্ববাসী তাকিয়ে ছিল ইরান যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান, জলবায়ু পরিবর্তন বা বিশ্বশান্তির মতো বৈশ্বিক ইস্যু এবং গাজা ও অন্যত্র বিপর্যস্ত মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে— যা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সম্ভাব্য পরাশক্তিদ্বয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যমূলক কাঠামো তৈরি করতে পারে।
আপাতত দুই নেতার কেউই সেরকম বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি। ডোনাল্ড ট্রাম্প আগ্রহ দেখাননি কারণ তার কাছে আশু অর্থনৈতিক প্রাপ্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; তার মাথায় ঘুরছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। আর শি জিনপিংয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়ক্ষেপণ এবং চলমান বিশ্বব্যবস্থার আপাত স্ট্যাটাস কো বজায় রাখা। শি জিনপিং জানেন, ওরকম বৈশ্বিক ভূমিকা নিতে চীনের আরও সময়ের প্রয়োজন; ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়তে গেলে সবকিছু ভেস্তে যেতে পারে।
অবশ্য ট্রাম্প এক হাতেও তালি বাজাতে পারেন। কিছু না পেয়েও তিনি মুখ ফুলিয়ে এমন অভিনয় করতে পারেন—যেন তার মুখ ভরতি খাবার। ইরান যুদ্ধের কোনো মীমাংসা না হলেও তিনি ঘোষণা করতে পারেন যে, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ভিয়েতনামে, সোমালিকায়, সুদানে, আফগানিস্তানে ও ইরাকে এই ধরনের ‘জয়’ আগেও দেখেছে।
ট্রাম্পের এই গানের সঙ্গে তাল মেলাতে যদি ইলন মাস্করা মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে বসে যান, তবে মঞ্চ মাতানোর জন্য একটি সুন্দর অর্কেস্ট্রার জন্ম হতেই পারে। ট্রাম্প সেই অর্কেস্ট্রার পরিকল্পনা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছেন এবং হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই ‘চীন জয়ের অর্কেস্ট্রা’ স্থানও পেয়েছে।
এদিকে শি জিনপিং আছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। চীনের জনগণের কাছে তাকে অর্কেস্ট্রা নিয়ে যেতে হয় না। সেজন্যই তিনি তার মুখে বিরামহীন হাসি ধরে রাখতে পারেন— যা দেখে মনে হয় এক প্রজ্ঞার হাসি।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত






