বাস্তবতার এই দিনগুলিতে শহীদুল জহির

শহীদুল জহির। ছবি: সংগৃহীত
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের সাহিত্য রচনার অমসৃণ মানচিত্রে যারা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন অথবা বাসেন না—উভয়পক্ষের সামনেই আজকের বাংলাদেশে তার লেখা ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। তাতে দুটো লাভ হয়েছে। প্রথমত, অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত শহীদুল জহির আবারও নিজস্ব আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন। তার লেখা নতুন করে পাঠ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে পাঠকের মনে।
দ্বিতীয়ত, এই সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তার লেখার বাস্তবতাকে মিলিয়ে নেওয়ার একটা ঝোঁক তৈরি হয়েছে। তাকে নিয়ে অথবা তার লেখালেখির সক্ষমতা নিয়ে অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক ড. সলিমুল্লাহ খানের কিছু মন্তব্যসংবলিত একটি ভিডিও পাঠকদের মাঝে তর্ক উসকে দিয়েছে। সাহিত্যিক এবং মন্তব্যকারী উভয়েই এখন ঝোড়ো বিতর্কের কেন্দ্রে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিষয়টি নিয়ে এখন সরগরম। বহু আড্ডায় উত্তাপের ব্যারোমিটারে পারদ বিপৎসীমা অতিক্রম করছে। কোথাও চিৎকারের অনুনাদে চিন্তার জানালার কাচ ভেঙে পড়ছে, কোথাও আবার সাহিত্য রচনায় লেখকের স্বাধীনতা, সমালোচনার অধিকার আর মন্তব্যের পেছনে লুক্কায়িত রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক সূত্রের নিঃশব্দ বিশ্লেষণ চলছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনার ঝড়কেও পেছনে ফেলে দিয়েছে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে ঘিরে বিস্ফোরক বিতর্ক।
একজন লেখক মঙ্গলগ্রহে বসবাস করেন না; তিনি একটি নির্দিষ্ট সমাজ, অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সংস্কৃতির আবহের মধ্যে বিকশিত হন। তার লেখার ভেতরে সেই সামাজিক বাস্তবতা যে ছায়াপাত করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক পরিবর্তন, যুদ্ধ, মহামারি অথবা অর্থনৈতিক সংকটের মতো বড় ঘটনাগুলো একজন সচেতন লেখকের মনোজগৎকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।
সংকট আর সামাজিক উত্থান অথবা পতনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তার অভিজ্ঞতা ভাবনার প্রেক্ষাপট একটি বিন্দুতে মিশে যায়। মনের মধ্যে একধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া তাকে লিখতে একরকম বাধ্য করে।
মিথ্যার ওপর ভর করে সাহিত্য রচিত হয় না। মিথ্যার উপাদান ব্যবহার করে কোনো লেখক যদি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে তা সাহিত্য হয়ে উঠবে না। যদি আজকের বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন, ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা এবং ক্ষমতার চরিত্রকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তাহলে শহীদুল জহির রচিত উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ প্রাসঙ্গিক লেখা হিসেবে সামনে দাঁড়ায়।
সলিমুল্লাহ খান মূলত এই উপন্যাসটিকে কেন্দ্রে রেখে লেখক শহীদুল জহিরের প্রতি বক্রোক্তি ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি একটি বক্তৃতায় বলেছেন, শহীদুল জহিরকে তিনি তৃতীয় শ্রেণির লেখকও মনে করেন না। তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘তার ল্যাঙ্গুয়েজটা টোটালি বোরিং। অন্যদিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের যে চিত্র এঁকেছেন, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়, সম্পূর্ণ ফলস। মাথায় টুপি দিয়ে রাজাকার বানানো, এই যে স্টিরিওটাইপ, এটা মুক্তিযুদ্ধের কোনো সত্যকে প্রকাশ করে না।’
বহু সচেতন পাঠক প্রশ্ন তুলেছেন, টুপি পরিহিত অথবা টুপি না পরা রাজাকারের চরিত্র কি একটি উপন্যাসের মান নির্ধারণ করে? আমার বিবেচনায় শহীদুল জহিরের লেখা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নয়, বরং উপন্যাসের কাহিনি আমাদের জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে মানুষের আদর্শিক জায়গাগুলো কীভাবে ক্ষমতার কাছে পরাজিত হয়েছে, একটি স্বাধীনতাযুদ্ধের রাজনৈতিক স্মৃতি, একটি জাতির স্বাধীনতালাভের আকাঙ্ক্ষার পেছনে সক্রিয় উপাদানগুলো কেমন করে পাল্টে গেছে। সেখানে একজন রাজাকারের মাথায় টুপি থাকায় গোটা উপন্যাসটি কেমন করে চিন্তাহীনভাবে গৎবাধা হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্নটি চিন্তার ভেতরে উত্তর ছাড়াই ঘোরাফেরা করে।
ক্ষমতার দাপট অথবা ভীতিকর কোনো রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে অবস্থান করেও একজন লেখক সত্যকে তার লেখায় প্রকাশ করেন, তখন তিনি পাঠকের প্রতি, মানুষের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কাছে সৎ হয়ে ওঠেন। শহীদুল জহির উপন্যাসটি লিখেছেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বসে। ততদিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে বহু পরিবর্তন ঘটে গেছে।
রাষ্ট্র, রাজনৈতিক বৈধতা, ইতিহাসের ওপর দিয়ে অনেক স্রোত বয়ে গেছে। বলা যায়, শহীদুল জহির তার উপন্যাসে সেই বদলের সূত্রগুলোকেই তুলে ধরেছেন কাহিনির দুটি সমান্তরাল ও ছায়াচ্ছন্ন ধারার ভেতর দিয়ে।
শহীদুল জহিরের আরেকটি উপন্যাস ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’। এই উপন্যাসের অন্দরমহলে ভয় একটি চরিত্র। কাহিনির বিন্যাসে একটি সমাজের মধ্যে ক্রমশ ভয় কীভাবে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তা বলতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভয় আসলে শুধু ভয়ের রাষ্ট্র তৈরি করে না, সমাজ তৈরি করে, গুজব সৃষ্টি করে, এমনকি বিশ্বাসও সৃষ্টি করে।
আজকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর আমাদের জীবন, গুজব উৎপাদন করে হিংসাত্মক ঘটনার জন্ম দেওয়া, বিভ্রান্তি তৈরি করে জনমত গঠন করার এই জনআতঙ্কের যুগে এই উপন্যাসটি আবার নতুন করে পাঠ করা যায়।
শহীদুল জহির গল্প লিখেছেন। গল্পে তিনি প্রথাগত গল্প বলার যে ঢং বা রীতির সীমানার বাইরে আসার চেষ্টা করেছেন। তাকে অনেকেই লেখায় জাদুবাস্তবতার প্রয়োগকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু তার গল্পের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, তার বড় কৃতিত্ব হচ্ছে বাংলাদেশে ক্ষমতার সমাজতত্ত্বকে সাহিত্যে সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন। তার চরিত্ররা বক্তৃতা দেয় না; কিন্তু তাদের দৈনন্দিন জীবন, ভাষা, ভয়, নীরবতা ও স্মৃতির মধ্যে দিয়ে আমাদের ইতিহাস ও ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রণালী স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তার গল্পে প্রধান একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে এই রাজধানীর ‘পুরান ঢাকা’। সেখানকার বিভিন্ন অলিগলি, এলাকা তার লেখায় জীবন ফিরে পায়। সেখানকার নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, একাকীত্ব, যৌথ জীবন তার গল্পে গুরুত্ব পেয়েছে।
যেকোনো সাহিত্যিকের লেখা সমালোচনার বাইরে নয় কখনোই। যেকোনো সমালোচকই একজন লেখকের রচনাকে কাটাছেঁড়া করে দুর্বলতার জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারেন। কিন্তু সমালোচক কখনোই ভিলেন হয়ে উঠতে পারেন না। তাকে আক্রমণ করে তার চিন্তাকে, লেখার সক্ষমতাকে, ভাবনার স্বাধীনতাকে দমন করতে পারে কি না সে বিষয়টা ভাবার সময় এসেছে বলে মনে হয়।







