৩.৫ ট্রিলিয়ন ইউরো ঋণে ফ্রান্স, সতর্কবার্তা অর্থনীতিবিদদের

ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋণে ফ্রান্স, ঝুঁকিতে ইউরোজোন। ছবি: সংগৃহীত।
রেকর্ড পরিমাণ সরকারি ঋণের চাপে নতুন করে অর্থনৈতিক উদ্বেগে পড়েছে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ফ্রান্স। দেশটির সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউরো অতিক্রম করায় শুধু ফ্রান্স নয়, পুরো ইউরোজোনের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্যারিসভিত্তিক জাতীয় পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইনসি) এবং সরকারি হিসাব নিরীক্ষার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত ‘কোর দে কম্প্ত’-এর সর্বশেষ যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে ফ্রান্সের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫৩৬ ট্রিলিয়ন ইউরোতে। এটি দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে ঋণ বেড়েছে ৭৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো।
প্রতিবেদনে দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উচ্চ ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশন ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতিকে ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণের সুদ পরিশোধ এখন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক বাজারে সুদের হার বাড়ায় সরকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ সুদ বাবদ ব্যয় করতে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঋণের সুদ পরিশোধই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাতে পরিণত হতে পারে।
ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা আদালত ‘কোর দে কম্প্ত’ সতর্ক করে বলেছে, সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ফ্রান্সের ঋণমান ও আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংস্থাটির মতে, ব্যয় কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ফ্রান্সকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমবাজার সংস্কার এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আইএমএফ সতর্ক করেছে, ঋণ এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
ঋণ সংকটকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক বাড়ছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে সরকারের দাবি, কোভিড-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যয় ছিল প্রয়োজনীয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের চাপ অব্যাহত থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জলবায়ু মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়বে, যা অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ফ্রান্সের আর্থিক অবস্থার প্রভাব পুরো ইউরোজোনের বাজার ও ইউরোর স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে। তাই আগামী মাসগুলোতে সরকার কীভাবে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনে, সেদিকেই নজর থাকবে অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের।




