যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি...

রাজধানীর উত্তরায় নিজের বইয়ের দোকানে ইউনুস সিকদার
অন্তিমে এসে জ্যৈষ্ঠ মাস নিঃশ্বাস ফেলছে ড্রাগনের মতো। যতদূর চোখ যায় চিকচিক করছে রোদ। ধুলো উড়ে যাচ্ছে ঢাকা নগরীর উত্তরা মেট্রো স্টেশনের দিকে। আকাশের দিকে মুখ বাড়ানো রেলপথের ৭০ নম্বর পিলার পার হয়ে একটু ডানে ঢুকলেই দোকানটা। রাস্তা ঘেঁষে টিন দিয়ে ঘেরা লম্বামতো একটা দোকান। বইয়ের দোকান। শেলফে প্রচুর বই সাজানো। পৌঁছেই শুনতে পাই ‘সিকদার বই বিতান’-এর ভেতরে হারমোনিয়াম বাজছে শব্দ তুলে। ইউনুস সিকদার গান গাইছেন—
‘যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি...’।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে পাশের চায়ের দোকানটা বন্ধ। বিব্রত মুখে হাসলেন ইউনুস সিকদার। হারমোনিয়াম বন্ধ করে জানালেন, ১৯৯৩ সালে ঢাকার মৌচাকের পাশে ছোট্ট একটা দোকান নিয়ে পুরনো বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখনো শহরটা চারপাশে এতটা ছড়িয়ে পড়েনি। নিরিবিলি শহরে বইয়ের ব্যবসা মোটামুটি জমে উঠেছিল তার। কিন্তু দুই কন্যার লেখাপড়া আর ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোটাতে রাজধানীর পাট চুকিয়ে দিতে হয়। পরবর্তী গন্তব্য পটুয়াখালী। সেখান থেকে ঝালকাঠি শহরে একটি বইয়ের দোকান করে আবার নতুন করে জীবনের শুরু। তার জন্ম বাউফলে। প্রাথমিক লেখাপড়াও সেখানে। কিন্তু ঝালকাঠিতেও বই ব্যবসা জমে ওঠার মুখে আবার বিপর্যয় ঘটল। ম্লান হেসে ইউনুস সিকদার বললেন, ‘জানেন, বইয়ের ব্যবসা সেখানে ভালোই হচ্ছিল। কিন্তু অনেক দেনা হয়ে গেল বাজারে। আর চালাতে পারলাম না। ব্যাংকে জমানো টাকাও ফুরিয়ে গেল একটু একটু করে।’
ক্যানসারে ভুগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর দুই কন্যা নিয়ে বিপদের সমুদ্রে ভেলা ভাসান তিনি। তখন আত্মীয়স্বজনও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। মাঝেমধ্যে আত্মহত্যা করার কথাও ভাবতেন ইউনুস সিকদার। কিন্তু জীবনের হাল শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেননি। দুই মেয়েকে নিয়ে জয়দেবপুরে শিববাড়ীর মোড়ে আরেকটি বইয়ের দোকান খুলে বসেন। কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে পুরনো বই বিক্রির ব্যবসা জমিয়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত তা আবার মুখ থুবড়ে পড়ে কর্মচারীদের অবহেলায়। সে সময়ে ব্যবসার অংশীদার হয়েছিলেন আত্মীয়রাও। তাদের ঔদাসীন্যও ব্যবসা পড়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ ছিল। খানিকটা অভিমানেই সবকিছু গুটিয়ে নেন তিনি। ততদিনে নিজে আরেকটি বিয়ে করেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ঠিকঠাক সংসার করা হয়ে ওঠেনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়নি নানা কারণে। তাই আবারও রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসার কথা ভাবতে শুরু করেন তিনি। স্ত্রীকে পটুয়াখালীতে রেখে ঢাকায় ফেরার পথ ধরেন।
‘এবার আর কাউকে জানাইনি ঢাকায় আসার কথা। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু— কাউকে না। পাঁচ মাস হলো ঢাকায় এসে আবার বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছি।’ ঢাকার এই উত্তর প্রান্তে এসে বইয়ের দোকান করলেন! ব্যবসা কেমন চলছে? প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, ঢাকায় এসে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের স্যান্ডেল ক্ষয়ে গিয়েছিল। শেষে উত্তরায় এসে পরিচয় রিংকু সিকদার নামে এক তরুণের সঙ্গে। রিংকুই তাকে জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তারপর পটুয়াখালী থেকে কিছু বইপত্র এনে এখানে দোকানের সূচনা। নতুন ঠিকানায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
দোকানের লাগোয়া একটা ঘর বেঁধে থাকেন ইউনুস সিকদার। সেখানেই বইয়ের গুদাম তার। ‘কী খান?’ জানতে চাইলে বললেন, ‘জগাখিচুড়ি বেশিরভাগ সময়ে।’ অর্থাৎ সবজি মিশিয়ে এক ধরনের খিচুড়ি। নিজেই রান্না করেন। মাঝেমধ্যে বইয়ের ক্রেতারা খাবার দিয়ে যান। দিন চলে যায় তার।
হতাশ লাগে না কখনো? এই অনিশ্চিত জীবন প্রশ্ন তোলে না— ‘কী করলাম এতদিন?’
গভীর সংকটের মধ্যে থেকেও হাসতে ভুলে যাননি ইউনুস সিকদার। হেসেই উত্তর দিলেন, ‘না। অনিশ্চয়তার ভেতরে আমি জীবনের অর্থ খুঁজে ফিরি। একা থাকতে খারাপ লাগে না আমার।’
গান কবে থেকে আপনার সঙ্গী? জানতে চাইলে বললেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে। তখন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এই দোকানেই ছুটির দিনে গানের আসর বসে। আশপাশের অনেকে আসেন। সবাই মিলে গান গাই, গান শিখি একজন গানের শিক্ষকের কাছে।’
ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছেন কবে থেকে? উত্তরে বললেন, “বই আমাকে বরাবরই টানে। ছাত্রজীবনে রুশ সাহিত্যের বহু বই পড়েছি। নিকোলাই অস্ত্রভস্কির লেখা ‘ইস্পাত’ উপন্যাস খুব প্রিয়। বই পড়তে পড়তেই বইয়ের ব্যবসায়ে আসা। এখন এই বইয়ের চালায় থাকার জীবনটা ভালো লাগে।”
‘আপনার জীবনের স্বপ্ন কী?’ প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ ভাবলেন ইউনুস সিকদার। বাইরে তখন চোখ রাঙাচ্ছে জ্যৈষ্ঠ মাসের রোদ। ধুলো উড়িয়ে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়ির বহর; মানুষের কথাবার্তা ছিটকে আসছে দোকানের ভেতরে। নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘আমার স্বপ্ন গান গেয়ে গেয়ে সারা দেশে বই বিক্রি করা। মানুষের কাছে বইকে ছড়িয়ে দেওয়া। এই স্বপ্নটুকু সফল করতে পারলে আমি খুশি।’
চলে আসার সময় আবার হারমোনিয়াম খুলে গান গেয়ে উঠলেন ইউনুস সিকদার, ‘যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি...।’
ফিরে আসি। পেছনে থেকে যায় ইউনুস সিকদারের বইয়ের শেলফ, কয়েকশ বই আর লড়াইয়ের অসমাপ্ত গল্প।



