প্রিয়তমার গালের তিলের বদলে

প্রিয়তমার গালের একটি তিলের বদলে সমরকন্দ আর বোখারা বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ইরানের কবি হাফিজ। তখন নিশ্চয়ই সুন্দর ছিল সেই দুটি শহর। সেখানে সড়কে নিশ্চয়ই আবর্জনা পড়ে থাকত না, লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা ছিল না, বাজারে সবজি অগ্নিমূল্য ছিল না, মানুষ মব ভায়োলেন্সের শিকার হতো না, নদী দূষিত হতো না, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যেত না, ছিনতাইকারী আর চাঁদাবাজদের প্রবল প্রতাপে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাত না। সমরকন্দ বা বোখারায় তখন নিশ্চয়ই আনন্দ ছিল, উৎসব ছিল, উল্লাস ছিল, ভালোবাসা ছিল। হয়তো যন্ত্রণার ভাগশেষও ছিল। বিরহ ছিল, কারও প্রস্থানের বেদনায় গাছের পাতায় বেদনার সুর বাজত; ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে কবি নিজের শহরকেই বিলিয়ে দিতে উদ্যত হতেন প্রিয়তমার গালের কালো তিলের জন্য।
কিন্তু এই রাজধানী শহরকে কেউ কি প্রিয়ার গালের কালো তিলের জন্য বিলিয়ে দিতে চাইবেন এখন? মনে হয় না। আর কেউ সে ইচ্ছা পোষণ করলেও এই শহরের বিনিময়ে প্রিয়তমার মন টলে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় একটি সেমিনারে বলেছেন, এখন ঢাকা আর বসবাসের যোগ্য নেই; এখানে নিঃশ্বাস নেওয়ারও অবস্থা নেই। তিনি নিজেই কখনো কখনো গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কাগজে প্রকাশিত খবরটায় চোখ আটকে থাকে। মাথার ভেতরের দেয়ালে মাথা কোটে দুশ্চিন্তা— এ শহরটা বোধহয় নিজের কাছ থেকে নিজেই দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমাগত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা। সরকারের মন্ত্রীও বটে। এই শহর নিয়ে মনের সত্যি ভাবনাটাকেই তিনি মঞ্চে প্রকাশ করেছেন। নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতো আরও বহু মানুষ এখন এই শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবেন। তারা সাধারণ নাগরিক। নিজের মতপ্রকাশের জন্য কোনো মঞ্চও তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে না। এই শহর, এই ঝলমলে আলোর ঝরোকা, জীবনের উৎসব তাদের কাছে এক বিমুখ প্রান্তরে পরিণত হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। কোথায় ফেলে আসা নদীতীর, সবুজ গ্রাম, মেঠোপথ হয়তো তাদের মনের মধ্যে ফিরে যাওয়ার বাসনাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। এই শহর তাদের প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছে, অন্নের জোগান দিচ্ছে, বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগাচ্ছে। কিন্তু এ বিশাল রাজধানীতে মানুষের জীবনমানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? ধুলোমলিন দূষিত বাতাস ফুসফুসে জায়গা দিয়ে, জীবনের দাবি, সংসারের চাহিদা মেটাতে মেটাতে তাকে বেঁচে থাকতে হয় এখানে।
এই শহর এখন বহু মানুষের কাছে গুলজার হয়ে ওঠা এক নরক। দিনের শুরু অথবা দিনের শেষে এখানে বেসুরো হয়ে যায় সব সুর। ভৈরবী অথবা পূরবীকে আলাদা করা যায় না। ফুল ফুটল কি ফুটল না, তা নিয়ে ভাবনার অবসর আর নেই। শুধু বেঁচে থাকার যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়েছে এক কলোসিয়াম। আমরা ক্রমাগত সেই দ্বৈরথের মাঠে গ্ল্যাডিয়েটরের মতো লড়ছি। কিন্তু শৃঙ্খলমুক্তির কোনো আশা নেই।
আমরা কেউ কবি হাফিজের মতো প্রিয়তমার গালের তিলের জন্য এই শহরকে বিনিময়যোগ্য করে তুলতে পারিনি। সেই প্রেমিকার মনের দাম এই শহর মেটাতে পারবে না।




