ট্রাম্প-পুতিন-অরবানকে চপেটাঘাতের এখনই সময়

আগামীর সময় গ্রাফিক্স
হাঙ্গেরির নির্বাচন কেন ভূ-রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ? কেন গত ৮০ বছরের সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের চেয়ে আলাদা? এসব বিষয় বোঝার জন্য দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে সমর্থন দেওয়া দুটি সরকারের নাম জানাই যথেষ্ট।
চমকপ্রদভাবে এই তালিকায় আছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে হাঙ্গেরির ক্ষমতায় অরবান। সগর্বে ‘অ-উদারতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ কায়েম করা অরবানকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হাঙ্গেরির স্থানীয় সময় ১২ এপ্রিল মধ্যরাতে জানা যাবে অরবানের ‘অ-উদারতান্ত্রিক’ অংশ বেশি শক্তিশালী নাকি ‘গণতন্ত্র’। আরও জানা যাবে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাগয়ারের জনমত জরিপে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান কিনা।
মাত্র ১ কোটি মানুষের দেশ হাঙ্গেরি। অরবানের শাসনামলে দেশটির অর্থনীতি ছিল স্থবির। কিন্তু পুতিন ও ট্রাম্পের আগ্রহই বলে দেয়, এই নির্বাচনের গুরুত্ব ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য কতটা। ইউক্রেন ও ইইউকে পুতিন এবং ট্রাম্প দুজনেই করেন তাচ্ছিল্য।
পুতিন, ট্রাম্প ও অরবান মিলে গঠন করেছেন ‘ইইউ-বিরোধী অক্ষ’। তারা পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে প্রচার করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। এ কারণেই ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি নির্বাচনের প্রচারণার সময় মনে করেছেন অরবান থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ
ইউক্রেনের জন্যও এই নির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২২ সালে দেশটিতে রুশ আগ্রাসনের পর থেকে অরবানের সরকার কাজ করেছে পুতিনের এক ‘প্রকাশ্য গোপন এজেন্ট’ হিসেবে, আর তাও ইইউর ভেতর। দেশটির মূল কাজ ছিল ইউক্রেনে ইইউর সহায়তায় বাধা দেওয়া। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগেও ইউক্রেনের জন্য ইইউর ৯ কোটি ইউরোর বিশেষ ঋণের প্রস্তাবটি আটকে দিয়েছেন অরবান।
ভ্লাদিমির পুতিন ও ভিক্টর অরবান । ছবি: সংগৃহীতসৌভাগ্যবশত, এই তহবিল না পেলেও কিয়েভ বর্তমানে মস্কোর সঙ্গে যুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থানে। তাদের নিজস্ব ড্রোন ও মিসাইল রাশিয়াকে সমান তালে জবাব দিতে সক্ষম। রুশ বাহিনীর কাছ থেকে বেশ কিছু ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারও করেছে তারা। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের নিশ্চিত করেছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
তবে এই ধারা টিকিয়ে রাখতে ইইউ ও যুক্তরাজ্যের অর্থ এবং রসদ প্রয়োজন। ট্রাম্প সমর্থন দেবেন না— জানে ইউক্রেন। তবে কিয়েভ এটুকু নিশ্চিত ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্স। হামলার সময় তারা এখনই পাবেন না।
কোন সত্য এড়াচ্ছেন ট্রাম্প?
বর্তমান ভূ-রাজনীতির রহস্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছয় সপ্তাহের হামলার মুখেও যে রুশ সমর্থনে টিকে আছে ইরান সরকার। এই সত্য পুরোপুরি এড়িয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প ও ভ্যান্স। ট্রাম্প যখন রাশিয়া, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিদের জন্য ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি সমর্থন করেন আর ছোট দেশগুলোকে অন্য চোখে দেখেন— তা দুঃখজনক হলেও বোধগম্য। কিন্তু যখন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেখছেন তার সক্রিয় শত্রুদের পক্ষ নিচ্ছে রাশিয়া ও চীন; তবুও তিনি উদাসীন।
এদিকে অরবান কেন ইউক্রেনকে রুশ সাম্রাজ্যের দখলে দেখতে চাইছেন— তাও অস্পষ্ট। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল আন্দোলন করে, হাঙ্গেরির ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। যদিও তার রাজনৈতিক সাফল্যের বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেনীয়, ইহুদি বা অন্যদের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষ ছড়িয়ে জনসমর্থন আদায়ের ওপর।
এ নির্বাচনের যেমন ব্যবহারিক গুরুত্ব আছে, তেমনি প্রতীকী গুরুত্বও ব্যাপক। এটি মূলত ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্প-পুতিন-অরবান অক্ষের হামলা থেকে ইউরোপীয় জীবনযাত্রা রক্ষার লড়াই
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর তেলের নির্ভরতা না কমিয়ে উল্টো বাড়িয়েছে হাঙ্গেরি। যখন অর্থের প্রশ্ন আসে, তখন ভণ্ডামি আর রহস্য থাকে না। যদিও ইইউ দেশগুলো রুশ তেল কেনায় সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু তার বন্ধু অরবান যে এর প্রধান হোতা তিনি হয়তো তা বোঝেন না অথবা পাত্তা দেন না।
গত সপ্তাহে তিনি ভ্যান্সকে পাঠিয়েছিলেন অরবানের পক্ষে প্রচারণা চালাতে, বুদাপেস্টে। অথচ ভ্যান্স উল্টো ইইউ ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তুলেছেন হাঙ্গেরির নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ। ইইউ নেতারা অবশ্যই চাচ্ছেন অরবান যেন নির্বাচনে হেরে যায়। কারণ তার অধীনে হাঙ্গেরি এখন অস্বস্তির কারণ। তিনি কেবল ইউক্রেন সহায়তায় বাধা দিচ্ছেন না, বরং বিলম্ব ঘটাচ্ছেন অভিবাসন ও আশ্রয় সংক্রান্ত অভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভিক্টর অরবান। ছবি : রয়টার্স
অরবানের কৌশল কি কাজ করবে
হাঙ্গেরি এখন ইইউর জন্য বড় লজ্জা। কেননা ২০০৪ সালের পর এ জোটে যোগ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতি, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি অধঃপতন দেশটির।
আজকের হাঙ্গেরি যদি ইইউর সদস্যপদ চাইত, তারা বাদ পড়ত। কারণ ইইউর সদস্য হওয়ার ন্যূনতম মানদণ্ড এখন তাদের নেই। অরবানের আমলে বিশেষ করে দুর্নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে চরম অবনতি হয়েছে— তা মূলত ইইউর দুর্বলতার প্রকাশ। এতে বোঝা যাচ্ছে একবার সদস্য হওয়ার পর কোনো দেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর উপায় নেই জোটের।
ইইউর হাতে থাকা একমাত্র অস্ত্র তহবিল আটকে দেওয়া। দেরিতে হলেও তা হয়েছে হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে। কিন্তু অরবান এই সুযোগে চেষ্টা করছেন ইইউকে হাঙ্গেরির ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের। এই নির্বাচনেই বোঝা যাবে এই কৌশল কাজ করবে কিনা।
ইইউ-বিরোধী অক্ষ
পুতিন, ট্রাম্প ও অরবান মিলে গঠন করেছেন ‘ইইউ-বিরোধী অক্ষ’। তারা পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে প্রচার করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। এ কারণেই ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি নির্বাচনের প্রচারণার সময় মনে করেছেন অরবান থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও শুরুতে অরবানের প্রচারণামূলক ভিডিওতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মেরিন লে পেনের পাশাপাশি দাঁড়ানোর ভুল করেছিলেন।
তবে অরবানের সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদী সখ্যতা বড় রাজনৈতিক ভুল। কারণ এটি ইউক্রেন ও ইইউর পক্ষে তার অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রমাণ করে মেলোনি নিজেও সম্ভবত সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে চালাতে চান ‘অ-উদারতান্ত্রিক গণতন্ত্র’।
হাঙ্গেরিতে নির্বাচনের যেমন ব্যবহারিক গুরুত্ব আছে, তেমনি প্রতীকী গুরুত্বও ব্যাপক। এই নির্বাচন মূলত ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্প-পুতিন-অরবান অক্ষের হামলা থেকে ইউরোপীয় জীবনযাত্রা রক্ষার লড়াই।
পিটার মাগয়ার ও তার দলের জয় আনবে না কোনো আদর্শিক পরিবর্তন। কারণ নীতিগতভাবে তিনি ডানপন্থি ও অরবানের সাবেক সহকর্মী। কিন্তু এটি হবে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও ইউরোপের প্রতি এক সভ্য ও সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ফিরে আসার পথ।
অরবানের মিত্ররা হাঙ্গেরির প্রতিষ্ঠানগুলোর গভীরে প্রোথিত। তাই কঠিন হবে এই পরিবর্তন। তবে পরিবর্তনের সূচনা জরুরি। সেই সঙ্গে ট্রাম্প ও পুতিনের মতো শক্তিগুলোকেও চপেটাঘাত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: দ্য ইকোনমিস্টের সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ‘দ্য ফেট অব দ্য ওয়েস্ট’ গ্রন্থের রচয়িতা

