শিক্ষাব্যবস্থা এমন কেন, যেখানে নকল করা যায়

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই সোশ্যালে চর্চায় ছিল ‘হেলিকপ্টার মিলন’ শব্দযুগল। আগের মেয়াদে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে হেলিকপ্টারে চড়ে তার কেন্দ্রে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো এখনো স্মরণে রেখেছে সেই প্রজন্ম। প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে। তবে এখন হেলিকপ্টারের বদলে সিসিটিভিতেই নকল ঠেকানোর উদ্যোগ তার। এর সঙ্গে যুক্ত হবে আধুনিক স্মার্টফোন ও স্যাটেলাইট সুবিধা।
ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হেলিকপ্টারের স্মার্ট সমাধান তো মন্ত্রী বাজারে নিয়েই আসলেন। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা শিক্ষার্থী সমাজ তো তার মতো একধাপে এগোতে পারেনি ২০ বছর। মন্ত্রী যেহেতু মালয়েশিয়া থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি, তার মনোভাব কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারি। তার কাজের ওপর নির্ভর করা যায়, উদ্দেশ্য মহৎ।
এ যুগে এসে আমাদের শিক্ষার্থীদের করতে হয় নকল। কিন্তু প্রশ্ন হলো শিক্ষাব্যবস্থা এমন কেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নকল করতে পারে? তারা যেটা নকল করে সেটাই কীভাবে পরীক্ষায় আসে?
কিন্তু কাজ যতই মহৎ হোক না কেন— সেটা সব সময় সুফলই বয়ে আনবে না। মাধ্যমিক পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর যতটুকু শেখা হয় তা যথেষ্ট নয়। যে পদ্ধতি এবং কারিকুলামে শিখছে তাও মার্কেট উপযোগী নয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাও নয়। দায়িত্ব নিয়েই বলা যায়, মাধ্যমিক পর্যন্ত সমস্যার ভুক্তভোগী শুধু বাংলাদেশই নয়।
গতকাল সোমবার দুটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও ইনডিপেনডেন্ট শিরোনাম করেছে ‘এক্সাম অবসেসড স্কুল’। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মন্ত্রিসভার সদস্য অ্যালেন মিলবার্নের রিভিউর ওপর ভিত্তি করে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছেপেছে তারা। তবে লেখাগুলো পড়ে মনে হয়েছে বাস্তবিকই।
একই চিত্র দেখা যায় দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায়ও। তাই অনুবাধন কিংবা তুলনা করা যায় নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই। যে সিস্টেমে বেড়ে উঠেছি এবং প্রজন্মগুলো বেড়ে উঠছে, সেখানে চোখে পড়ছে না উপযুক্ত ‘আপগ্রেড’।
আজকাল একটা স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও কয়েক মাস পরপর কিংবা বছরে একবার হলেও আরও উন্নত সংস্করণ ইনস্টল করতে হয় বা নিজে নিজেও হয়। অথচ ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ প্রবাদ পড়ে বড় হলেও মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারছি না। এ যুগে এসে আমাদের শিক্ষার্থীদের করতে হয় নকল। কিন্তু প্রশ্ন হলো- শিক্ষাব্যবস্থা এমন কেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নকল করতে পারে? তারা যেটা নকল করে সেটাই কীভাবে পরীক্ষায় আসে? না এলেও সেই নকল কেন্দ্রের বাইরে বসেই কীভাবে তৈরি হয়?
ব্রিটেনের স্কুল শিক্ষার্থীরা অদক্ষতা নিয়েই যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রে। তাতে দুশ্চিন্তায় সংশ্লিষ্টরা। দেশের তরুণরাই যদি বাজারের জন্য, সমাজের জন্য অনুপযোগী অবস্থায় থাকে, তাহলে দেশ এগোবে কী করে? তরুণদের মেধাসংকট বা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও অন্তত শ্রমটা তো কাজে লাগানো যায়।
শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজার মেট্রোয় আসার পথে এক যাত্রীর মন্তব্য এখনো কানে বাজে। ‘এখনকার ছেলেমেয়েদের ফল অনেক ভালো কিন্তু ভেতরে কিছু নাই’
দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা অতিরিক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়িয়ে ফেলেছি। সেই পুরনো কারিকুলাম। নতুন কিছু যেন রপ্তই করতে চাচ্ছি না। স্নাতক পাস করেও ফেসবুকে সময় কাটে। কী পড়লাম, কেন পড়লাম বুঝে ওঠার আগেই চাকরির জন্য নতুন করে শুরু করতে হয় পড়াশোনা। তাহলে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কি পড়ানো হলো?
শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজার মেট্রোয় আসার পথে এক যাত্রীর মন্তব্য এখনো কানে বাজে। ‘এখনকার ছেলেমেয়েদের ফল অনেক ভালো কিন্তু ভেতরে কিছু নাই।’ সিস্টেমের কথা কল্পনা করে কথাটা ভাবি এখনো। আসলেই ভেতরে ‘কিছু নাই’ কিন্তু সিজিপিএ বেশি। থামাতে হবে এই সংখ্যার খেলা। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্য শিক্ষার নামে সন্তানদের ওপর হচ্ছে জুলুম।
অলস কুঁড়ে বানানোর পাশাপাশি অন্ধকারের দিকে আমাদের সমাজ। বোর্ড কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ভালো স্থানধারীরা সংখ্যার খেলা ব্যবহার করছে পয়সা রোজগারের হাতিয়ার হিসেবে। সামাজিকমাধ্যমে নিজের প্রচারণা করে জড়িয়ে পড়ে কোচিং ব্যবসায়। টিকে থাকার জন্য করতেই হয়। টিউশন আর কোচিংনির্ভর সিংহভাগ শিক্ষার্থী। কেউ পড়ায় আর কেউ পড়ে। এ ছাড়া করার মতো কাজের সুযোগও নেই। দিনশেষে পজিশনধারীরা উচ্চশিক্ষার মুনশিয়ানা দেখাতে পারে না গবেষণা খাতে। কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পড়ার বাইরে হয় না তেমন জ্ঞান অর্জন।
যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী যেমন গবেষণায় পেয়েছেন কমিউনিকেশন ও কোলাবেরশন এবং অ্যাজিলিটি ও ক্রিয়েটিভিটি— শিক্ষার্থীরা এই দক্ষতাগুলো স্কুল থেকে শিখতে না পারলে তারা হতে পারবে না মার্কেট উপযোগী জনশক্তি। বছর বছর শিক্ষায় সরকারি ব্যয়ের তুলনায় কতটা লাভ হচ্ছে তার হিসাব কখনো চোখে পড়েনি। তাও কীভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা অজানা নয়। কষ্টের টাকার বরাদ্দের বিনিময়ে উপযুক্ত লাভ না পেলে কীভাবে শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নতি ও প্রগতি আসবে?
বছর বছর শিক্ষায় সরকারি ব্যয়ের তুলনায় কতটা লাভ হচ্ছে তার হিসাব কখনো চোখে পড়েনি
সিলেবাস এমনই কেন হবে যেটা মুখস্থ না করলে হচ্ছে না অথবা শিক্ষকরাই এমনভাবে কেন পড়াচ্ছেন না, যাতে নকল করার সুযোগই কমে যায়? এত পাঠ্য বইনির্ভর জ্ঞান ২-৩ ঘণ্টা পরীক্ষার হলে উগড়ে দিয়েই বা কি ফায়দা? কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারছি না বইয়ের জ্ঞান। এই বই মুখস্থ করার জন্য কিশোর-তরুণরা ব্যয় করছে বছরের পর বছর।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার আগে ব্যয়ের সুষ্ঠু খাত ও এর বিনিময় নিশ্চিত জরুরি। মিলবার্নের সুরেই বলতে হয়, তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের চেয়ে পরীক্ষার ফলে বেশি গুরুত্ব দিলে কঠোর সমালোচনা ও ক্ষতির মুখে পড়বে শিক্ষাব্যবস্থা।

