সীমান্তে কাঁটাতার নয়, দরকার মানবিকতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সীমান্তের ভোর। একজন বৃদ্ধ কৃষক তার নাতিকে বললেন, ‘কাঁটাতারের ওপারেও মানুষ, এপারেও মানুষ। সীমান্তের উদ্দেশ্য মানুষকে রক্ষা করা, আতঙ্কিত করা নয়।’ কথাটি কেবল আবেগ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনারও মৌলিক দর্শন। কারণ সীমান্তের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য, মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার জন্য নয়।
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এই সীমান্তকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই সীমান্ত বহু বছর ধরেই প্রাণহানি, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম এসব ঘটনা নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের মুখেও প্রায়ই দুর্ব্যবহার, দুর্নীতি ও চোরাচালানকে ঘিরে নানা অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কর্তব্য।
সাম্প্রতিক সময়ে কথিত ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের বিশেষ করে দরিদ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা হয়েছে। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য নয়, মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক আইনের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কোনো মানুষকে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভারতের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা বিএসএফের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, যেকোনো নিরাপত্তা বাহিনীর মতো তাদের কার্যক্রমও নিয়মিত মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই। সমালোচনাকে দুর্বলতা নয়, বরং উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
ভারতের অন্যান্য সীমান্তে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষায়িত বাহিনী দায়িত্ব পালন করে। নেপাল ও ভুটান সীমান্তে রয়েছে এসএসবি, চীন সীমান্তে আইটিবিপি, আর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সীমান্তে প্রধানত বিএসএফ। এই বাস্তবতা নীতিনির্ধারকদের সামনে স্বাভাবিক প্রশ্ন রাখে— বাংলাদেশ সীমান্তের বর্তমান ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর, মানবিক ও আস্থাভিত্তিক করার জন্য নতুন কোনো কাঠামো বা পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে কি? প্রয়োজনে বিএসএফের জন্য মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নৈতিকতা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ কিংবা বিকল্প ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারত শুধু প্রতিবেশী নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বহু সুতোয় আবদ্ধ। এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং আইনের শাসন। সীমান্তে প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনকেই প্রভাবিত করে না; তা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রের ক্ষমতায় নয়, বরং ক্ষমতাহীন মানুষের প্রতি তার আচরণে প্রতিফলিত হয়। সীমান্তে যদি মানবিকতা হারিয়ে যায়, তবে কাঁটাতারের দুই পাশেই পরাজিত হয় মানুষ। তাই সীমান্তকে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয় বরং মানবিকতা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক আস্থার আলোয় নতুন করে দেখার সময় এসেছে। সেটিই হবে বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের কল্যাণের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক পথ।
লেখক : সহ অর্থনৈতিক সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি




