ধন্যবাদ
আলো ছড়ানো সাধারণ মানুষদের অসাধারণ গল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা পরিচিতির আলোর বাইরে দাঁড়িয়ে, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে, কেবল নিজের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা এক অদৃশ্য আলো নিয়ে পথ চলেন। তাঁরা বিখ্যাত নন, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান না, পুরস্কারের মঞ্চে নাম ডাকা হয় না তাঁদের। তবু তাঁরাই সমাজের আসল মেরুদণ্ড। তাঁদের কথা না জানলে আমরা আসলে নিজেদের চেনাই অসম্পূর্ণ রাখি।
নাটোরের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেলের কথাই ধরুন। রক্তের কোনো টান নেই, বংশের কোনো দায় নেই, তবু ১০৮ জন এতিম মেয়ের বিয়ের সমস্ত আয়োজন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। যে মেয়ের বাবা নেই, মা নেই, যে বড় হয়েছে দাদা-নানার সংসারে কিংবা মাদ্রাসার কোণে, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে সেই মেয়ের পাশে বাবা হয়ে দাঁড়িয়েছেন রুবেল। ভালোবাসা যে কেবল জন্মের সূত্রে আসে না, এই একটি মানুষ সেটা প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন।
এর পাশে রাখুন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্পটি। অভাবের কারণে বেশিদূর পড়তে পারেননি। জীবিকার টানে বিদেশে গিয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালিয়েছেন বছরের পর বছর। কিন্তু সেই উপার্জনের পয়সায় দেশে গড়েছেন ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হাসপাতালের জন্য জমি কিনেছেন। আর ৬৪ বছর বয়সে নিজে ভর্তি হয়েছেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার প্রতি এই যে অদম্য প্রেম, এটা কোনো পাঠ্যবইয়ে শেখানো যায় না।
সুনীলের কথা বললে মনে হয় যেন একটা চলমান পাঠাগারের গল্প শুনছি। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার সেই পাঠাগারে পাঠককে আসতে হয় না, বই নিজেই চলে যায় পাঠকের দুয়ারে। বই পড়ার সুযোগ যাদের নেই, সময় নেই, পথ নেই, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই পাঠাগারের কাজ। জ্ঞানকে যদি সত্যিকার অর্থে মুক্ত করতে হয়, তাহলে এভাবেই করতে হয়।
রংপুরের আরিফা জাহান বীথি নামের তরুণীটি জাকাতের টাকায় একজন রিকশাচালককে নতুন রিকশা কিনে দিয়েছেন। হয়তো এটা ছোট একটি কাজ, কিন্তু ছাবের আলীর পরিবারের কাছে এই রিকশাটা কেবল একটি যান নয়, এটি একটি নতুন জীবনের শুরু। বীথি এভাবেই একা একা অনেক মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যানার ছাড়াই।
জহির রায়হান পেশায় রঙমিস্ত্রি, কিন্তু তাঁর রঙের তুলি কেবল দেয়ালকেই রাঙায় না। বারো বছর ধরে রাস্তার পাশে গাছ লাগাচ্ছেন, দেয়ালে মনীষীদের বাণী লিখছেন, পশুপাখির জন্য আশ্রয় গড়ছেন, মাঠের কৃষকের জন্য নলকূপ বসাচ্ছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যা শেখাতে পারেনি, তা তিনি শিখেছেন জীবনের পাঠশালায়।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অরবিন্দ বিশ্বাস পেনশনের টাকায় হাজারো বাড়িতে গাছের চারা পৌঁছে দিয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই কাজ করছেন নিঃশব্দে। সেই গাছগুলো এখন ফল দিচ্ছে, ছায়া দিচ্ছে। একজন শিক্ষক অবসরেও শেখানো থামাননি, কেবল মাধ্যমটা বদলে গেছে।
আমেনা বেওয়ার হাতে পৃথিবীর আলো দেখেছেন প্রায় পাঁচ হাজার নবজাতক। ষাটের দশকে যখন গ্রামে কোনো প্রশিক্ষিত ধাত্রী ছিল না, হাসপাতাল ছিল দূরের স্বপ্ন, তখন নিরুপায় এক কিশোরী আমেনা প্রথমবার সাহস করে একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সাহস আজও থামেনি। সংসারের টানাপড়েন, নানা সংকট, কোনো কিছুই তাকে এই মানবিক দায়িত্ব থেকে সরাতে পারেনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আজহার উদ্দিন নিজের সময়, শ্রম আর অর্থ খরচ করে ২৫১টি বেওয়ারিশ লাশের দাফনের ব্যবস্থা করেছেন। যাদের কেউ নেই, যারা রাস্তায় মরে পড়ে থাকেন, তাদের শেষ যাত্রায় পাশে থাকেন আজহার। এর চেয়ে বড় মানবিকতা আর কী হতে পারে?
আর সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক, যিনি জীবনে মাত্র একদিন স্কুলে গিয়েছিলেন, লিখতে পারেন না, অথচ বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অনেক শিক্ষিত মানুষকেও লজ্জা দেয়। দারিদ্র্য তাঁর পায়ে শিকল পরাতে চেয়েছিল, কিন্তু জ্ঞানের তৃষ্ণাকে শৃঙ্খলিত করতে পারেনি।
এই মানুষদের গল্পই প্রতিদিন বলে 'আগামীর সময়'। পত্রিকার মাস্টহেডের পাশে 'ধন্যবাদ' শিরোনামে যাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাঁরা কেউ সেলিব্রিটি নন, কেউ ক্ষমতাবান নন। তাঁরা কেবল মানুষ, তবে সত্যিকারের মানুষ। তাঁদের গল্প বলা দরকার, কারণ এই গল্পগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ আসলে কতটা সুন্দর হতে পারে। হতাশার ভিড়ে এই মুখগুলো আমাদের সাহস দেয়, বিশ্বাস দেয় যে পৃথিবীটা এখনো ভালো আছে।






