পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন
বাংলার কপালে কি জয়ের অভিশাপ?

সংগৃহীত ছবি
সাধারণত পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখা হয় ভোটের হার বৃদ্ধিকে। কিন্তু বাংলার, মানে পশ্চিমবঙ্গের সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি হয়তো টিকে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা মাত্র। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ।
বেশি ভোট মানেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—এমন সরল অঙ্ক করা ভুল। এর অর্থ এমনও হতে পারে, তৃণমূলের সমর্থকরা ভয়ের কারণেই, মানে বিজেপি ঠেকাতে বেশি সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন, যাতে সরকার বদলালেও তাদের ওপর কোনো বিপত্তি না নেমে আসে।
এমনটা দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালের নির্বাচনেও। বিজেপি ক্ষমতায় এলেও যে পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হবে না, হয়তো তা-ই মনে করছেন তৃণমূল সমর্থকরা।
প্রথম দফার নির্বাচনে বিজেপি ভালো ফল করেছিল, অন্যদিকে দ্বিতীয় দফায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন বিজেপির চ্যালেঞ্জকে। তাই প্রথম দফার ফলই যে সবকিছুর শেষ কথা, তা নয়। রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া যে বইছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু তিক্ত সত্য হলো, যে দলই জিতুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গ খুব একটা লাভবান হবে না। জয়ী দলকে ‘জয়ের অভিশাপ’ বা ‘উইনার্স কার্স’-এর মুখোমুখি হতেই হবে।বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসন এবং তার পরবর্তী তৃণমূল জমানায় বাংলার অর্থনৈতিক ভিত্তি এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজনীতি এবং হিংসার এই আবহে নতুন কোনো চিন্তার অবকাশ কোথায়? উন্নয়ন বা প্রশাসনিক সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখাই হবে জয়ী দলের প্রধান লক্ষ্য।
ধরা যাক, তৃণমূল আবার জিতল। ২০২১ সালের বড় জয়ের পরও তারা বিরোধীদের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে। রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো বড় সংস্কারও তারা করেনি। এখন বিজেপির মতো শক্তিশালী বিরোধী দলের সামনে দাঁড়িয়ে তারা নতুন করে সংস্কারে মন দেবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। আমলাতন্ত্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থাও এখন শোচনীয়। তারা সংবিধান মেনে চলার বদলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশ পালনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে আগের মতোই ভরসা করবেন স্থানীয় পেশিশক্তির ওপরই।
আর যদি বিজেপি জেতে? দিদি তার ক্ষত সামলে ফের রাস্তায় নামবেন। ঠিকমতো কাজ করতে দেওয়া হবে না বিজেপি প্রশাসনকে। তা ছাড়া বাম, কংগ্রেস এবং অন্য দলগুলো তখন রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হয়ে উঠবে। তৃণমূলের মতোই বিজেপিকেও হয়তো তখন নির্ভর করতে হবে স্থানীয় মাফিয়াদের ওপরই। যে দলই জিতুক, ‘জয়ের অভিশাপ’ তাদের পিছু ছাড়বে না। বাংলা হয়তো থেকে যাবে সেই তিমিরেই।
তৃণমূলের বোঝা উচিত, জয় মানেই জনগণের ইতিবাচক সমর্থন নয়। আবার বিজেপির ক্ষেত্রেও, জয় মানে শুধু তৃণমূলকে সরিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা, তাদের নীতির প্রতি সমর্থন নয়। এ ধরনের জয় আদতে কারোই জয় নয়।
দ্য প্রিন্ট থেকে অনূদিত। লেখক : প্রবীণ সম্পাদক




