বিদায় তোফায়েল আহমেদ
বাংলাদেশের উন্মেষ-ইতিহাসের অন্যতম সারথীর প্রস্থান

তোফায়েল আহমেদ। গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন, অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন, বয়স হয়েছে, শরীর ভেঙে পড়ছিল বারবার। একাধিকবার মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল। সত্যি বলতে, মনের গভীরে যেন একরকম প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। তবুও আজ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়ার খবরটি শুনলাম, বুকটা কেমন যেন ‘খালি খালি’ হয়ে গেল।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় আজ চিরতরে ‘নাই’ বা ‘প্রয়াত’ হয়ে গেল। অবসান হলো ৮২ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবনের।
সোমবার (১ জুন) বিকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান এই নেতা। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে পাশে ছিলেন একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী ও ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা। স্ত্রী আনোয়ারা বেগমকে রেখে গেছেন অনেক আগেই। আজ বাবা-মা’র কাছে ফিরে গেলেন ছেলেটি, যে একদিন বাঙালির ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর, ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামে। বাবা মৌলভী আজহার আলী, মা ফাতেমা বেগম। দ্বীপ জেলা ভোলার ছেলে। বর্ষা-বাদলের জলকাদা পেরিয়ে, ইলিশের পেটে সোনা খোঁজা সেই গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণ একদিন ঠায় দাঁড়িয়ে পড়লেন ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ছাত্র-জীবনেই তার মধ্যে রাজনীতির আলোড়ন দেখা গিয়েছিল। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ঢাকায় পাড়ি জমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে, পরবর্তী সময়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন। কিন্তু মাটি পরীক্ষার চেয়ে মানুষের মাটির টানই যেন তাকে বেশি টেনেছিল। সেই টানেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন। এরপর ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। ঠিক সেই সময়েই বাঙালির ইতিহাস বাঁক নিচ্ছিল এক ভয়াবহ ঝড়ের দিকে।
তোফায়েল আহমেদের নাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে নিজের সভাপতিত্বে এবং সতীর্থ ছাত্র সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
১৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় প্রত্যক্ষ আন্দোলন। ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে শপথ গ্রহণ করে ছাত্রসমাজ। ২৪ জানুয়ারি মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীরের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক, ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বুলেটে শহীদ হন। বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আর এই পুরো সময়টাতেই সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
ইতিহাস বলে, তার ডাকে সেদিন রাজপথ উত্তাল হয়েছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের ভিত কেঁপে গিয়েছিল। অবশেষে সেই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সবাইকে মুক্তি দিতে।
এরপরের গল্পটা তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কিংবদন্তি। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার এক সভার আয়োজন করে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে। সেদিনের সেই জনসমুদ্র যারা দেখেননি, তাদের বলে বোঝানো যাবে না। উপচে পড়া মানুষ, কানায় কানায় পূর্ণ রেসকোর্স।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, শামসুদ্দোহা, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, জামাল হায়দার, মাহবুবউল্লাহ, ফকরুল ইসলাম মুন্সি, ইব্রাহিম খলিল, নাজিম কামরান চৌধুরী— সবাই উপস্থিত। সভাপতিত্ব করছিলেন তোফায়েল আহমেদ। কিন্তু শেখ মুজিবের ভাষণের আগেই তাকে কথা বলতে হয়।
ছাত্রনেতারা আগেই ঠিক করেছিলেন, শেখ মুজিবকে একটি বিশেষ উপাধি দেওয়া হবে। ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে একটি কবিতার কথা মনে পড়ে তাদের। সেই উপাধিটিই বেছে নিলেন তারা। তারপর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা করলেন সেই ঐতিহাসিক বাক্যগুলো— ‘আমি ঘোষণা করলাম, বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান, হাজার বছরের মহাপুরুষ, নিপীড়িত লাঞ্ছিত, প্রবঞ্চিত বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলাম। আজ থেকে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’
এরপর লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘বঙ্গবন্ধু’ নাম। ইতিহাসের গতিপথ সেদিন যেন স্থির হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ পরবর্তী জীবনে বলেছিলেন, ‘২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়ার দিন। একটা ছাত্রের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?’ সত্যিই তাই। ইতিহাসের মহানায়কের অভিষেক, আর তার ঘোষক— এই ভূমিকাটি তাকে অমর করে রাখবে বাংলার প্রতিটি আন্দোলনের ইতিহাসে।
১৯৬৯ সালেই তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের ৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি ভোলার দৌলত খাঁন-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর এলো বাঙালির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়— মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তোফায়েল আহমেদ প্রতিরোধের অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। তার অধীনে ছিল পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্ব। তরুণ বয়সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। অস্ত্র হাতে নয়, কৌশল আর সংগঠনের মাধ্যমে লড়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি বাঁকে জড়িয়ে থাকবে তার অবদানের কথা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তোফায়েল আহমেদ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন, ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলন, ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন— এমন নানা আন্তর্জাতিক সফরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গেছেন।
এ ছাড়া সাবেক যুগোস্লাভিয়া, ইরাক, জ্যামাইকায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনেও তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী ছিলেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী নিযুক্ত হন। তরুণ তোফায়েল তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস— ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা ইতিহাসের ভয়াবহতম হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তোফায়েল আহমেদের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সেই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। টানা ৩৩ মাস কারাগারে কাটান। ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায়ও দলের প্রতি আনুগত্য অটুট রাখেন, নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
কারামুক্তির পর শুরু হয় সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরপর তিনবার ভোলার নিজের প্রিয় আসন (পরে ভোলা-১) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। দেশের শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে তার নেওয়া নীতিমালা আজও সুফল বয়ে চলেছে।
পরবর্তী সময়ে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও টানা জয়লাভ করেন। নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলান। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ের পরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই ছিলেন। প্রবীণ বয়সেও দলের সংকটে নীতিনির্ধারক ভূমিকা রেখেছেন। সর্বমোট ৯ বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে কারাভোগ করতে হয়েছে অসংখ্যবার, কিন্তু কখনো স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি, দলের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
তোফায়েল আহমেদের জীবন মানেই বাংলাদেশের রাজনীতির দশকের পর দশকের ইতিহাস। তিনি দেখেছেন ভাষা আন্দোলন পরবর্তী অস্থিরতা, পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, ছয় দফার ভিত্তিতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের উত্থান। নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে। প্রত্যক্ষ করেছেন বঙ্গবন্ধুর জাদুকরি নেতৃত্বে একটি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের সংগ্রাম। যুদ্ধ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। হার মেনেছেন পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের বেদনায়, কিন্তু ভেঙে পড়েননি। এরপর এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম, একুশ শতকের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন— সবখানেই তার উপস্থিতি ছিল নীরব অভিভাবকের মতো। দলের কঠিন সময়ে ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যার। আবার প্রয়োজনে সমালোচনাও করেছেন, নীতি-আদর্শের প্রশ্নে আপস করেননি কখনো, সমালোচনা করে হাসিনার রোষানলে পড়ে নিষ্ক্রিয় এবং অপাংক্তেয় হয়ে পড়েছেন দলে।
ব্যক্তি তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সাদামাটা, নিরহংকার। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে ঘিরে ছিল তার সংসার। কন্যা চিকিৎসক, সমাজসেবায় যুক্ত। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কখনো বিতর্কে জড়াননি। সাক্ষাৎকারে স্মৃতিকাতর হয়ে উঠতেন, বলতেন সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা, রেসকোর্স ময়দানের লাখো মানুষের ঢল, বঙ্গবন্ধুর কাছে ছুটে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। ইতিহাসের নানা চরিত্রকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তবু নিজে কখনো আত্মপ্রচারে বিশ্বাসী ছিলেন না। বরং পর্দার আড়ালেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তবে দলের প্রয়োজনে যখনই ডাক পড়েছে, ছুটে গেছেন। ভোলার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘তোফায়েল ভাই’— একনিষ্ঠ অভিভাবক, যাকে যেকোনো সমস্যায় পাশে পাওয়া যায়।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো। ৮২ বছরের পথ চলায় তিনি যা অর্জন করেছেন, তা বিশাল মহিরুহসম। ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারির রেসকোর্স ময়দানের সেই বিকাল, লাখো কণ্ঠের ‘বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি— সেই ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়ানো তরুণটি চিরতরে মিশে গেলেন মহাকালে। কিন্তু তার কাজ, আদর্শ, সংগ্রাম বাঙালিকে চিরদিন অনুপ্রাণিত করবে।
আজ বাঙালির এই শোকের দিনে দেশবাসী শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কিংবদন্তি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদকে। তার মরদেহ ভোলায় নেওয়া হবে, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ নামের যে অধ্যায়, তা শুধু মাটির নিচে চাপা পড়বে না। তা উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে, থাকবে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেরণায়, থাকবে বাংলার মানুষের হৃদয়ে।
রাজনীতির উত্থান-পতন, পাওয়া-না পাওয়ার হিসেবের ঊর্ধ্বে উঠে তোফায়েল আহমেদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন ইতিহাস-পুরুষ হিসেবে। বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের সমাপ্তি ঘটল। ওপারে ভালো থাকবেন তোফায়েল ভাই। আপনার হাতে ঘোষিত ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি যতদিন বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ এবং বাঙালি টিকে থাকবে, ততদিন অম্লান থাকবে। আর আপনার নামটিও জড়িয়ে থাকবে সেই ইতিহাসের প্রতিটি পরতে পরতে। ইতিহাসের মহানায়ক, বিদায়।










