মোনাজাতউদ্দিন
একজন আলোকচিত্রী, একজন চারণ সাংবাদিক

সংগৃহীত ছবি
মোনাজাতউদ্দিন বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন। শুধু সাংবাদিকতা নয়, কথাসাহিত্যিক হিসেবেও তার খ্যাতি কম ছিল না। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমার কাছে মোনাজাতউদ্দিন একজন সফল আলোকচিত্রী। অসাধারণ অনেক ছবি তুলেছেন তিনি এবং সবগুলোই নিউজ ফটোগ্রাফি। বাংলাদেশে সেই আমলে সম্ভবত মোনাজাতউদ্দিনই একমাত্র সংবাদকর্মী, যিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিউজ এবং সংশ্লিষ্ট নিউজের ছবি একসঙ্গে তুলে আনতেন। দৈনিক সংবাদে তার রিপোর্টের চেয়ে চোখ-ধাঁধানো ছবিই বেশি নজরে পড়ত পাঠকদের।
দীর্ঘদিন দেশের প্রাচীন পত্রিকা সংবাদে কাজ করার সুবাদে মোনাজাতউদ্দিন ‘সংবাদের মোনাজাতউদ্দিন’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।
ঢাকার দিলু রোডে তখন সাপ্তাহিক বিচিন্তার অফিস। ঢাকায় এলে প্রায়ই বিচিন্তা কার্যালয়ে আসতেন মোনাজাত ভাই। সম্পাদক মিনার মাহমুদের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তিনি।
সংবাদে তার তোলা ছবি দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম মোনাজাতউদ্দিন একজন গুণী আলোকচিত্রী। মিনার মাহমুদ মোনাজাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। আমি আলোকচিত্রী আককাস মাহমুদ। পরে মোনাজাত ভাই যখন জানলেন, আমার একটি ফটো স্টুডিও আছে, তখন থেকেই তার সঙ্গে আমার দারুণ সখ্য গড়ে ওঠে।
সাদা-কালো ফিল্মে ছবি তুলতেন মোনাজাত ভাই। ফিল্ম ডেভেলপ করারও বেশ ধারণা ছিল তার। আমরা দুজন বিচিন্তা অফিসে এবং স্টুডিও পদ্মায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফটোগ্রাফি নিয়ে আলাপ করতাম। স্টুডিও পদ্মার ডার্করুমে আমি যখন ফিল্ম ডেভেলপ করতাম, তখন প্রায়ই তিনি আমার সঙ্গে ঢুকে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচক্ষে দেখতেন।
বাজারে তখন কম দামে সাদা-কালো রিফিল পাওয়া যেত। এই প্রজন্মের ফটোগ্রাফাররা রিফিলের নাম শুনেছেন কি না জানি না। মোনাজাত ভাই রিফিল ব্যবহার করতেন। ১৫ টাকায় ৩৬ এক্সপোজারের এই ফিল্ম (রিফিল) তখন খুব জনপ্রিয় ছিল। তিনি নিজে যেমন রিফিল ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন, তেমনি আমাকেও রিফিল ব্যবহারে উৎসাহ দিতেন। আমি অবাক হতাম মোনাজাত ভাইয়ের ফটোগ্রাফির সেন্স দেখে।
একবার একটি ফিল্ম ডেভেলপ করার পর একটু সফট হয়ে গেল। মোনাজাত ভাই আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আককাস, তুমি তোমার ডেভেলপ করার কেমিক্যালে একটু হাইড্রোকুইনোন বাড়িয়ে দাও। ফিল্ম কনট্রাস্ট হবে। ছবি প্রিন্টের মানও অনেক গুণ ভালো হবে।’ সত্যিই তাই হয়েছিল।
মোনাজাত ভাইয়ের কাঁধে সব সময় একটি ঝোলা থাকত। একদিন সেই ঝোলা থেকে একটি রাশিয়ান জেনিথ ক্যামেরা বের করে খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘আড়াই হাজার টাকা দিয়ে গতকাল নিউমার্কেট থেকে কিনেছি। ফিল্ম ভরা আছে, ১০টি স্ন্যাপ তুলেছি মাত্র। তুমি ফিল্মটি কেটে ডেভেলপ করো।’
আমি ক্যামেরা এবং কাঁচি (সিজার) নিয়ে ডার্করুমে প্রবেশ করলাম। ফিল্মটি ডেভেলপ করে বের হতেই তিনি ভেজা ফিল্ম হাতে নিয়ে উল্লাস করে উঠলেন, ‘আহ! কী সুন্দর রেজাল্ট! দেখছো আককাস!’ এরপর রাশিয়ান জেনিথ ক্যামেরার প্রশংসা করে বললেন, ‘জেনিথ ক্যামেরার ওজন দেখছো?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, ক্যানন বা মিনোল্টার চেয়ে অনেক ভারী।’ মোনাজাত ভাই হেসে বললেন, ‘পথে কোনো ডাকাত ধরলে এই জেনিথ দিয়েই তার মাথা ফাটিয়ে দেওয়া যাবে।’
চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে অনুসন্ধানী সংবাদ তুলে আনতেন। তিনি ছিলেন তৃণমূল মানুষের সংবাদকর্মী। খবরের অন্তরালে যে খবরগুলো লুকিয়ে থাকে, তিনি ছিলেন সেসব তথ্য অনুসন্ধানের নেপথ্যের সাংবাদিক।
একদিন সন্ধ্যায় মোনাজাত ভাই স্টুডিও পদ্মায় এসে খুব উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘কী করি বলো তো আককাস! আমাকে তো দৈনিক জনকণ্ঠ বিশাল অফার দিয়েছে। কী করি, পরামর্শ দাও।’
আমি বললাম, ‘আপনি রাজি হয়ে যান। জনকণ্ঠের পাঠকসংখ্যা অনেক বেশি। পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার বিশাল সুযোগ পাবেন।’
মোনাজাত ভাই কিছু সাদা-কালো ছবি বিটু সাইজে প্রিন্ট করে চা পান শেষে দ্রুত চলে গেলেন। কয়েকদিন পর দেখি, দৈনিক জনকণ্ঠে তার নামে বিশাল একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সঙ্গে ছিল তার তোলা দারুণ একটি নিউজ ফটো। তখন বুঝলাম, ‘সংবাদের মোনাজাত’ এখন ‘জনকণ্ঠের মোনাজাত’।
আমার খুব ভালো লাগল। কারণ জনকণ্ঠ অফিস তখন নিউ ইস্কাটনে আমাদের স্টুডিও পদ্মার পাশেই ছিল। ফলে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো মোনাজাত ভাইয়ের সঙ্গে। তখন জনকণ্ঠের প্রচারসংখ্যাও দেশের সব দৈনিকের চেয়ে বেশি ছিল। আমার মতো অসংখ্য পাঠক তার মাটির ঘ্রাণমাখা ছবি ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পড়ার সুযোগ পেলেন। তিনি সত্যিই ছিলেন মাটি ও মানুষের চারণ সাংবাদিক।
বহু প্রতিভাবান এই সাংবাদিকের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা ১১টি গ্রন্থ এবং মাওলা ব্রাদার্স থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘মোনাজাতউদ্দিন রচনাসমগ্র’ গ্রামবাংলার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে পাঠকদের সম্যক ধারণা দেবে। বিশেষ করে, তরুণ সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা শাণিত করতে তার বইগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর, মাত্র ৫০ বছর বয়সে কর্মরত অবস্থায় মোনাজাতউদ্দিন মারা যান। বেঁচে থাকলে আজ আমরা তার ৮১তম জন্মবার্ষিকী পালন করতাম। জন্মদিনে তার অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অশেষ ভালোবাসা।
লেখক : সিনিয়র আলোকচিত্রী ও প্রধান নির্বাহী, ফটোগ্রাফি চর্চা






