মানি হাইস্টের প্রফেসর থেকে বার্লিন
কেন প্রতিনায়করাই জনপ্রিয় পপ-হিরো?

বিশ্বজুড়ে আবারও বাজতে শুরু করেছে ‘বেলা চাও’। যেন বহুদিন পর ফিরে এসেছে পুরোনো এক বিদ্রোহের সুর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৫ মে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে ‘বার্লিন’-এর নতুন অধ্যায়। আর সেই ঘোষণার পর থেকেই কোটি দর্শকের ভেতর আবারও জেগে উঠেছে লাল জাম্পসুট, দালি মাস্ক আর অসম্ভব এক ডাকাতির রোমাঞ্চ। যে সিরিজ একসময় স্পেনের টেলিভিশনে বাতিল হওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল, সেই ‘মানি হাইস্ট’ আজ পৃথিবীর অন্যতম বড় পপ-কালচার আইকন। শুধু একটি ওয়েব সিরিজ নয়—এটি এখন এক ধরনের বৈশ্বিক আবেগ, প্রতিবাদ আর অ্যান্টিহিরো প্রেমের নাম।
নেটফ্লিক্সের অফিসিয়াল ‘লা কাসা দে পাপেল’ হ্যান্ডলে একটি পোস্টে লেখা হয়— ‘বেলা চাও এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, মানি হাইস্টের বিশ্ব এখনও চলছে।’ এই একটি বাক্যই যেন ভক্তদের বুকের ভেতর পুরনো আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। কারণ ‘মানি হাইস্ট’ কখনও শুধু ডাকাতির গল্প ছিল না; এটি ছিল সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কিছু ‘প্রতিনায়ক’ মানুষের গল্প।
নায়ক আর খলনায়ক তো চিনি। কিন্তু প্রতিনায়ক বা এন্টিহিরো কী? প্রতিনায়ক হলো এমন এক কেন্দ্রীয় চরিত্র, যে পুরোপুরি নায়কও নয়, আবার খলনায়কও নয়। তার মধ্যে ভালো-মন্দ দুটো দিকই থাকে। সে ভুল করে, দুর্বল হয়, কখনো স্বার্থপরও হতে পারে—তবু গল্পের মূল আকর্ষণ থাকে তাকে ঘিরেই। যেমন শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’—সে সাহসী বা আদর্শ নায়ক নয়, বরং দুর্বলতা আর আত্মবিধ্বংসী আচরণের জন্যই তাকে প্রতিনায়ক বলা হয়। যেমন মহাভারতের কর্ণ—তিনি দানবীর, সাহসী ও মহৎ; কিন্তু জেনেও দুর্যোধনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এই দ্বন্দ্বময় চরিত্রই তাকে প্রতিনায়ক করে তোলে। তার মধ্যে বীরত্ব আছে, আবার ভুলও আছে; তাই তাকে একই সঙ্গে ভালোও লাগে, আবার প্রশ্নও জাগে।
মানি হাইস্টের ‘বার্লিন’ ও ‘প্রফেসর’—দুজনই ‘অপরাধী’, পৌরাণিক চরিত্রের প্রতিনায়কদের মতো। একজন ঠাণ্ডা মাথার রোমান্টিক ডাকাত, অন্যজন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডাকাতির মস্তিষ্ক। তবু পৃথিবীর কোটি কোটি দর্শক তাদের ঘৃণা করে না; বরং ভালোবাসে, তাদের জন্য কাঁদে, তাদের সংলাপ মুখস্থ বলে, এমনকি তাদের মুখোশ পরে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদও করে। কিন্তু কেন? কেন মানুষ প্রতিনায়কদের প্রেমে পড়ে? কেন আইন ভাঙা মানুষগুলোই হয়ে ওঠে দর্শকের আবেগের কেন্দ্র?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে যোগাযোগবিদ্যার ‘দর্শক-চরিত্র মানসিক সংযোগ’ তত্ত্বে। এই তত্ত্ব বলছে, দর্শক যখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনো চরিত্রের ভয়, ভালোবাসা, একাকীত্ব, ব্যর্থতা ও স্বপ্নের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সেই চরিত্র আর পর্দার কাল্পনিক মানুষ থাকে না—সে হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ। ‘মানি হাইস্ট’-এর প্রফেসর বা বার্লিন ঠিক সেভাবেই এক অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি করেছে দর্শকের সঙ্গে। ফলে ডাকাত হলেও দর্শকের চোখে তারা শুধু অপরাধী নয়; তারা বিদ্রোহী, প্রেমিক, দার্শনিক—কখনও কখনও অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন মানুষ ডাকাত চরিত্রের প্রেমে পড়ে? কেন বার্লিন বা প্রফেসরের মতো অপরাধীদের জন্য কাঁদে দর্শক? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ‘মানি হাইস্ট’-এর রাজনৈতিক ও মানবিক ভাষ্যে। চোখ ফেরাই আরো কিছু উদাহরণে। দস্যু বনহুর বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এক কাল্পনিক অ্যান্টিহিরো চরিত্র। লেখক রমেন দাস ষাটের দশকে কিশোরদের রোমাঞ্চের জগতে এই চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু বনহুর শুধু গল্পের দস্যু হয়ে থাকেননি; তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক বিদ্রোহী প্রতীক। ধনীদের লুণ্ঠন করে গরিবকে সাহায্য করা, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেওয়া, ছদ্মবেশে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে বনহুর ছিলেন রহস্যময় এক নায়ক। ঠিক তেমনি ব্রিটিশদের খাতায় মাস্টারদা সূর্যসেনও ছিলেন ‘ডাকাত’, কারণ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেছিলেন তিনি। অথচ ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে বিপ্লবী হিসেবেই। রবিনহুড আইনের চোখে অপরাধী ছিলেন, কিন্তু লোককাহিনিতে তিনি গরিবের আশ্রয়। মহাভারতের কর্ণ অন্যায়ের পক্ষে থেকেও আজও সবচেয়ে ট্র্যাজিক ও মানবিক চরিত্রগুলোর একটি, কারণ মানুষ তার বঞ্চনা ও অপমানের যন্ত্রণা অনুভব করে। হিন্দু ধর্মমতে ‘রামায়ণ’-এর রচয়িতা বাল্মীকিও একসময় ছিলেন রত্নাকর নামের দস্যু; বনপথে ছিনতাই করতেন, পরে আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবিক জাগরণ তাকে পরিণত করে ঋষিতে। আবার বিশ্বসাহিত্যে ‘দ্য গডফাদার’-এর ডন কর্লিওনে, ‘জোকার’-এর আর্থার ফ্লেক, ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর ওয়াল্টার হোয়াইট কিংবা ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর জ্যাক স্প্যারো—সবাই আইনভাঙা মানুষ, তবু দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছে।
আসলে পৃথিবীর ইতিহাস, সাহিত্য ও সিনেমায় বহু ‘প্রতিনায়ক’ আছেন, যাদের অপরাধের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সমাজের প্রতি গভীর ক্ষোভ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কিংবা মানুষের জন্য এক অদ্ভুত মমতা। ইংল্যান্ডের রবিনহুড, বাংলার বনহুর, চট্টগ্রামের সূর্যসেন, ভারতের ফুলন দেবী, মহাভারতের কর্ণ, বাল্মীকি, কিংবা আধুনিক পর্দার জোকার ও ওয়াল্টার হোয়াইট—সবাই কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্র, সমাজ বা প্রচলিত নৈতিকতার চোখে অপরাধী। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তারা হয়ে উঠেছেন প্রতিরোধের মুখ। কারণ মানুষ সবসময় আইনের ভাষায় বিচার করে না; মানুষ বিচার করে হৃদয়ের ভাষায়। তাই ‘মানি হাইস্ট’-এর প্রফেসর বা বার্লিনকেও দর্শক নিছক ডাকাত হিসেবে দেখে না। তারা দেখে এক অসম যুদ্ধ, এক চাপা বেদনা, এক বিদ্রোহী মানবিকতা। খোলা মনে তাকালে বোঝা যায়—এই আপাত দুষ্কর্মের গভীরে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে কোনও অপূর্ণ ন্যায়বোধ, কোনো হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, কিংবা মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর এক মরিয়া আকুতি।
ইতিহাস ও পুরান থেকে আবার ফিরে আসি মানি হাইস্টে। কভিড-১৯ মহামারির আগে এটি ছিল ফ্লপ ওয়েবসিরজ। নেটফ্লিক্সে যুক্ত হওয়ার পর ‘লা কাসা দে পাপেল’ বা ‘মানি হাইস্ট’ যেন নতুন জীবন পায়। এরপর একে ঘিরে তৈরি হয়েছে স্পিন-অফ ‘বার্লিন’, তথ্যচিত্র, ভিডিও গেম—এমনকি দালি মাস্ক ও লাল পোশাকও পরিণত হয়েছে প্রতীকে। অথচ শুরুটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। গল্প ছিল কয়েকজন ‘অপরাধী’র, যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের নিয়মে যুদ্ধ করবে। অধ্যাপক সার্হিও মারকিনা একটি দল গড়লেন, যাদের অনেকেই সমাজের প্রান্তিক মানুষ। পরিকল্পনা—স্পেনের জাতীয় টাঁকশালে ঢুকে ২৪০ বিলিয়ন ইউরো ছাপানো এবং সেই অর্থ নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। পরে সেই দলই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ডাকাতিও করে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো—দর্শকরা এসব অপরাধ দেখেও তাদের ঘৃণা করেনি, বরং ভালোবেসেছে।
প্রথমে নির্মাতারা ভেবেছিলেন, দুই পর্বেই শেষ হবে গল্প। কিন্তু দর্শকের উন্মাদনা তাদের হিসাব বদলে দেয়। একের পর এক সিজন তৈরি হয়। ২০২০ সালে নেটফ্লিক্স রেকর্ড দামে কিনে নেয় সিরিজটি। তারপর বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে টোকিও, নাইরোবি, রিও, ডেনভার আর সবচেয়ে বেশি—প্রফেসর ও বার্লিন। কারণ এই চরিত্রগুলো নিখুঁত নয়। তাদের ভেতরে আছে ক্ষত, অন্ধকার, ভালোবাসা, হিংস্রতা, ভয়, বেদনা—ঠিক মানুষের মতো। আর সেখানেই দর্শক খুঁজে পায় নিজেদের।
এই আবেগকে আরও উসকে দিতেই আজ বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেয়েছে ‘বার্লিন অ্যান্ড দ্য লেডি উইথ অ্যান আরমিন’। ‘মানি হাইস্ট’-এর সবচেয়ে রহস্যময়, আভিজাত্যপূর্ণ এবং বিপজ্জনক চরিত্র বার্লিনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই স্পিন-অফের দ্বিতীয় সিজন ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে। মূল সিরিজের অন্ধকার ও শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনাকে কিছুটা সরিয়ে এখানে নির্মাতারা এনেছেন ঝকঝকে, স্টাইলিশ এবং রোমান্টিক ক্রাইম ড্রামার স্বাদ। কিন্তু তাতেও বার্লিন তার স্বভাব বদলায়নি—সে এখনও একই সঙ্গে নির্মম, বুদ্ধিমান, রোমান্টিক এবং ধ্বংসাত্মক।
গল্প এবার ঘুরছে ফ্রান্সের প্যারিসকে কেন্দ্র করে। বার্লিন ও তার নতুন দল পরিকল্পনা করে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অকশন হাউস থেকে ৪৪ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের রাজকীয় রত্ন চুরির। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, নিখুঁত ব্লুপ্রিন্ট আর অদ্ভুত সব কৌশলে তারা প্রায় অসম্ভব সেই ডাকাতি সম্পন্নও করে ফেলে। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় অন্য জায়গায়। বার্লিন প্রেমে পড়ে ক্যামিলের—অকশন হাউসের সুপারভাইজারের স্ত্রীর। আর সেই প্রেমই ধীরে ধীরে নিখুঁত পরিকল্পনাকে ঠেলে দেয় বিপদের দিকে। পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় ভয়ংকর ইঁদুর-বিড়াল খেলা। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—একজন অপরাধী কি তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা থেকে পালাতে পারে? নাকি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিপর্যয়?
‘মানি হাইস্ট’-এ পেড্রো আলোনসোর অভিনীত চরিত্র আন্দ্রেস দে ফনোয়োসা, যাকে সবাই ‘বার্লিন’ নামে চেনে তিনি আবারও প্রমাণ করছেন কেন বার্লিন চরিত্রটি এত জনপ্রিয়। তার চোখের ভেতর একই সঙ্গে থাকে বিষণ্নতা ও উন্মাদনা। কখনও তিনি কবির মতো কথা বলেন, আবার পরমুহূর্তেই হয়ে ওঠেন নিষ্ঠুর। এই দ্বৈত সত্তাই দর্শককে টানে। তার সঙ্গে নতুন দলের সদস্যদের রসায়নও প্রাণ দিয়েছে সিরিজকে। ড্যামিয়ান, কেইলা, ক্যামেরন, রয়—প্রত্যেকেই যেন নিজস্ব ক্ষত আর ব্যক্তিগত অন্ধকার নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ। সিরিজের শেষদিকে অ্যালিসিয়া সিয়েরা ও রাকেল মুরিলোর ক্যামিও উপস্থিতি আবারও মূল ‘মানি হাইস্ট’-এর আবহ ফিরিয়ে আনে। দর্শক তখন বুঝতে পারে—এই ইউনিভার্স এখনও শেষ হয়নি।
বিশ্বখ্যাত পরাবাস্তব চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির মুখোশ আজ পৃথিবীর প্রতিবাদের প্রতীক। গত কয়েক বছরে বিশ্বের নানা বিক্ষোভে মানুষ দালি মাস্ক পরে রাস্তায় নেমেছে। কারণ এই মুখোশ কেবল ডাকাতির প্রতীক নয়; এটি সিস্টেমবিরোধী ক্ষোভের প্রতীক। যখন মানুষ রাষ্ট্র, অর্থনীতি বা ক্ষমতার কাছে নিজেকে অসহায় মনে করে, তখন তারা এমন চরিত্রের ভেতর মুক্তির কল্পনা খুঁজে পায়, যারা নিয়ম ভাঙতে ভয় পায় না।
প্রফেসর সার্হিওও ঠিক তেমনই এক চরিত্র। তিনি পেশিবহুল কোনো সুপারহিরো নন। মধ্যবয়সী, সাধারণ চেহারার এক মানুষ, যার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মস্তিষ্ক ও মানবিকতা। তার একটি নীতি ছিল—ডাকাতি হবে, কিন্তু খুন হবে না। জিম্মিদেরও সম্মান দিতে হবে। দর্শক এখানেই তাকে আলাদা করে দেখতে শুরু করে। কারণ তিনি শুধু অপরাধী নন; তিনি এক ধরনের নৈতিক বিদ্রোহী। কমিউনিকেশন স্টাডিজে এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘অ্যান্টিহিরো সাগা’। যেখানে ‘ভালো’ মানুষ নয়, বরং ‘ভুল’ করা মানুষদের প্রতিই দর্শক বেশি আবেগ অনুভব করে।
দালি মুখোশের আড়ালে কেন প্রেমে পড়ে বিশ্ব? কেন বার্লিন থেকে প্রফেসর হয়ে ওঠে আজকের পপ-হিরো? ‘মানি হাইস্ট’ ফিরতেই আবারও জেগে উঠেছে অ্যান্টিহিরো প্রেম। প্রতিনায়ক বার্লিন কেন দর্শকের হৃদয়ের নায়ক, কিংবা ডাকাত প্রফেসর কীভাবে হয়ে ওঠেন নৈতিক বিদ্রোহের প্রতীক—এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরছে বিশ্বজুড়ে। বেলা চাও আবার বাজছে, আর কোটি দর্শক এখনও সেই আইনভাঙা মানুষগুলোর পক্ষ নিচ্ছে। দালি মাস্কের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানবিক জাদু, প্রেম, বিদ্রোহ আর অসম্ভব ডাকাতির গল্প ‘মানি হাইস্ট’-কে শুধু একটি সিরিজ নয়, বরং বৈশ্বিক আবেগে পরিণত করেছে। বার্লিনের চোখে প্রেম, প্রফেসরের মাথায় বিপ্লব—এই দুইয়ের মিশ্রণেই দর্শক বুঝতে শিখেছে, খারাপ মানুষগুলোও কখনও কখনও সবচেয়ে মানবিক হতে পারে। তাই ‘মানি হাইস্ট’ শেষ হয় না; এটি বারবার ফিরে আসে মানুষের ক্ষোভ, স্বপ্ন আর বিদ্রোহের প্রতীকে।
মনোবিজ্ঞান ও মিডিয়া তত্ত্বও এই জনপ্রিয়তার ব্যাখ্যা দেয়। আধুনিক ওয়েব সিরিজে অ্যান্টিহিরো চরিত্র দর্শকের নৈতিক অনুভূতিকে চ্যালেঞ্জ করে। তারা সমাজের নিয়মের বাইরে থাকে, কিন্তু তাদের মানবিক দিক দর্শকের কাছে গভীরভাবে ধরা দেয়। ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর ওয়াল্টার হোয়াইট বা ‘মানি হাইস্ট’-এর প্রফেসর—দুজনই তার উদাহরণ। দর্শক জানে তারা অপরাধ করছে, তবু তাদের ব্যর্থতা, ভয়, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ দর্শককে আবেগতাড়িত করে। প্যারাসোশ্যাল ইন্ট্র্যাকশন থিউরি অনুযায়ী, দর্শক ধীরে ধীরে চরিত্রগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করে ফেলে। তারা আর কাল্পনিক থাকে না—বাস্তব মানুষের মতো মনে হয়।
প্রফেসরের নেতৃত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দলের প্রতিটি সদস্যের মানসিক অবস্থা বোঝেন, সমস্যা সমাধান করেন, একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন। ফলে দর্শক শুধু তার বুদ্ধিমত্তা নয়, তার মানবিক দিকেও আকৃষ্ট হয়। প্রতিটি চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব, প্রেম, ভয়, বিশ্বাসঘাতকতা—সব মিলিয়ে ‘মানি হাইস্ট’ হয়ে ওঠে আবেগের যুদ্ধক্ষেত্র। দর্শক তখন আর শুধু ডাকাতি দেখে না; তারা মানুষকে দেখে।
২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই সিরিজ আজও তাই সমান জনপ্রিয়। অধ্যাপক, টোকিও, নাইরোবি, বার্লিন—সবাই দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। সিরিজ দেখতে দেখতে মানুষ প্রেমে পড়ে যায় প্রফেসর আর বার্লিনের মতো ডাকাতদের। কারণ মানুষ কখনও নিখুঁত চরিত্রের প্রেমে পড়ে না; তারা প্রেমে পড়ে ভাঙা, অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ মানুষের। ঠিক যেমন মাওলানা রুমির সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘ঠিক-বেঠিকের বাইরেও একটা বারান্দা আছে; সেখানেই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে।’
প্রায় পাঁচ বছর পর আবারও খুলছে ‘মানি হাইস্ট’-এর দরজা। আবারও বাজছে বেলা চাও। ভক্তদের উত্তেজনা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি টিজার, প্রতিটি ছায়াময় দৃশ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মানুষ। কিন্তু সব কিছুর মাঝখানে একটাই প্রশ্ন নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে— কোন নতুন রূপে ফিরলেন ‘দ্য প্রফেসর’?
নেটফ্লিক্স সেই উত্তর দেয় না। লেখক হিসেবে আমি এই উত্তর দিলে তা হবে স্পয়লার। তবে একটি ইঙ্গিত শুধু ইঙ্গিত ছুড়ে দিই। নতুন মুক্তি পাওয়া বার্লিন-২ যেহেতু মানি হাইস্টের দুটো ব্যাংক ডাকাতিরও আগের ঘটনায় নির্মিত, তাই ফ্ল্যাশব্যাকে ভাই বার্লিনের স্মৃতির ভেতর হঠাৎ দেখা মিলবে প্রফেসরের। এক ঝলকে উপস্থিত হয় সেই পরিচিতি চশমার ফ্রেমে, সেই মাঝবয়সী হেয়ারকাট, কোট-টাই পরা ঠাণ্ডা মাথার প্রফেসর সার্হিও। এর বেশি কিছু আর জানা যাবে না। কারণ, নেটফ্লিক্স খুব ভালো করেই জানে— কিছু রহস্যকে পুরোপুরি উন্মোচন করে দিলে ‘বেলা চাও’ স্লোগানে বড়শী গাঁথা মাছের মতো করে দর্শককে টেনে আনা যাবে না। ‘লাল প্রতিরোধ’ বা ‘বিপ্লব’ নিয়ে হবে না ‘বিনোদন ব্যবসা’!
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
[email protected]






