আগামীর চোখ
বাক্সবন্দি বিস্ফোরক!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
স্ক্রল মানব-মানবীগণ
আপনাদের ৫/৬ ইঞ্চির নীল আলোর দুনিয়ায় আমাদের এই ধূলিধূসরিত, অন্ধকার বাক্স থেকে জানাই সশ্রদ্ধ ‘ডিজিটাল সালাম’। আশা করি, ঘাড় ৬০ ডিগ্রি বাঁকিয়ে, বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনটা ওপর-নিচে ঘষতে ঘষতে আপনারা অত্যন্ত ‘ব্যস্ত’ ও ‘সুখী’ সময় পার করছেন।
আমি সুখে নেই। একটি স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার পিচবোর্ডের বাক্সের ভেতর বন্দি। আমার মতো আরও লাখ লাখ ভাই-বোন এই কুঠুরিতে একসঙ্গে গাদাগাদি করে আছি। বাইরে আমাদের প্রিয় পাবলিক লাইব্রেরির বড় বড় হলরুমে এখন জমাট বাঁধা নীরবতা। ভুতুড়ে বাড়ির মতো খালি পড়ে আছে। কোনো পাঠকের জুতার আওয়াজ নেই। ধুলোবালি আর মাকড়সার জালই এখন আমাদের একমাত্র স্থায়ী সঙ্গী।
মাঝেমধ্যে দু-একজন ভুলোমনা পথিক লাইব্রেরিতে আসেন। তারা অবশ্য বই পড়ার জন্য আসেন না; আসেন লাইব্রেরির শান্ত পরিবেশে বসে মোবাইলের ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে ফেসবুকিং করতে কিংবা রিলস দেখতে। আমরা তখন বাক্সের কাচের ওপার থেকে তাদের মুখের ওপর ঠিকরে পড়া সেই চেনা নীল আলো দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
বাইরে আমাদের প্রিয় পাবলিক লাইব্রেরির বড় বড় হলরুমে এখন জমাট বাঁধা নীরবতা
আপনারা মানুষরা বড় অদ্ভুত। ফেব্রুয়ারি মাস বা বইমেলার সময় আমাদের নিয়ে আপনাদের মাতামাতির সীমা থাকে না। আমাদের বলেন— আমরাই জাতির বিবেক, আমাদের মতো সঙ্গী আর হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। কর্তাব্যক্তিরা আমাদের সামনে রেখে লম্বা ভাষণ দেন। অথচ কাজের বেলায় আমাদের স্থান হয় এই চারকোনা আষ্টেপৃষ্ঠে মোড়ানো বাক্সে। তবে এটা সত্যি যে, আমাদের ভেতরে জ্ঞান, প্রেম, বিদ্রোহ ও ইতিহাসের বারুদ লুকিয়ে আছে। আপনারা আমাদের মুক্ত রাখলে একালের শিশু-কিশোর-তরুণরা আরও কৌতূহলী হতো, জানার জন্য ব্যাকুল হতো। ওরা তো এখন প্রশ্ন করতেই ভুলে গেছে। তাই কি আমাদের বাক্সে তালাবদ্ধ করে রাখাটাই আপনাদের কাছে নিরাপদ মনে হয়েছে?
আপনাদের এই তীব্র ব্যস্ততার যুগে আমাদের একটাই মিনতি— কখনো যদি আপনাদের এলাকার বিদ্যুৎ চলে যায়, পাওয়ার ব্যাংকটাও ধোঁকা দেয় এবং ইন্টারনেট সার্ভার ক্র্যাশ করে (যা আপনাদের জন্য কেয়ামতের সমান), তখন দয়া করে একটু আমাদের এই বন্দিশালায় আসবেন। আমাদের গা থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে একটু পাতা উল্টে দেখবেন। আমরা আপনাদের কোনো ‘নোটিফিকেশন’ দেব না, কোনো ‘অ্যালগরিদম’ দিয়ে আপনাদের মগজ ধোলাই করব না কিংবা আপনাদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে অন্য কোথাও বিক্রিও করব না। আমরা নীরবে আপনাদের যে সাহচর্য, প্রশান্তি ও প্রজ্ঞা দেব— তা আপনাদের ওই ৫/৬ ইঞ্চির স্ক্রিন কোনোদিন দিতে পারেনি।
ইতি
ধূলিধূসরিত একটি বই
ভুতুড়ে গণগ্রন্থাগার, বাক্স নং-৪০৪



