আগামীর চোখ
যত পড়িবে তত মরিবে

প্রিয়
সহোদর,
আশা করি ভালো আছ। ভালো থাকার মতো বয়সে আছ বলিয়াই আশা করিতেছি। আমার মতো সনদপত্রের পাহাড় বুকে লইয়া বেকারত্বের মরুভূমিতে হাঁটিতে হইলে হয়তো এই আশাটুকুও থাকিত না।
তোমাকে কয়েকটি জরুরি কথা বলিবার আছে। প্রথমত, পড়ালেখা করিও, তবে বেশি করিও না। দেশে শিক্ষার সঙ্গে বেকারত্বের এক অদ্ভুত প্রেমের সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছে। যত শিক্ষিত হইবে, বেকারত্ব ততই তোমাকে ভালোবাসিবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তোমাকে চাকরি না দিলেও বেকারদের অভিজাত মহলে বসিবার আসন দিবে। নিরক্ষর লোকটি অন্তত জানে না, সে কী হারাইয়াছে। তুমি জানিবে, বুঝিবে, বিশ্লেষণ করিবে, তারপর চাকরির বিজ্ঞপ্তির নিচে নিজের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়া অপেক্ষা করিবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরির একেকটি পদের বিপরীতে ১০ হাজার প্রার্থী— ইহা নিছক প্রতিযোগিতা নহে, জাতীয় ঐক্যের এক বিরল নিদর্শন। আমরা সবাই একসঙ্গে একটি চাকরি চাই, আর রাষ্ট্র উদার হাতে আমাদের ধরাইয়া দেয় পরীক্ষার প্রবেশপত্র। পরীক্ষা স্থগিত হইলে অবশ্য রাজধানী অচল হয়। চাকরি না থাকিলে মানুষের জীবন অচল হয়।
তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় পাইও না। ইহা উৎপাদনশীলতা বাড়াইবে, অর্থনীতি বদলাইবে, কাজের ধরন পাল্টাইবে। শুধু তোমার কাজটি কোথায়, তাহা জানিতে পারিবে না। যন্ত্রের বুদ্ধি বাড়িতেছে, মানুষের ডিগ্রি বাড়িতেছে, আর চাকরির বাজারে জায়গা কমিতেছে। উন্নয়নের এই ত্রিভুজে তুমি কোন কোণে দাঁড়াইবে, তাহা তোমারই সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্র অবশ্য আশাবাদী। পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান হইবে। চমৎকার। শুধু কারখানা বন্ধ, বিনিয়োগ স্থবির, জ্বালানি অনিশ্চিত— এ সামান্য বিষয়গুলিকে হিসাবের খাতা হইতে বাদ দিলেই অঙ্ক মিলে যায়। অঙ্কে ভুল হইলে শিক্ষার্থী নম্বর হারায়; রাষ্ট্রের অঙ্কে ভুল হইলে নাগরিক হারায় ভবিষ্যৎ।
এত মানুষ বেকার হইলে দেশ চলিতেছে কীভাবে? প্রিয় সহোদর, দেশ চলে আশ্বাসে, পরিবার চলে ধারকর্জে, আর বেকার চলে আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন এড়াইয়া। ‘কী করছ এখন?’— এই একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে কত শিক্ষিত যুবক যে নীরবে বৃদ্ধ হইয়া যায়, তাহার কোনো জরিপ বিবিএস করে না।
অতএব, পড়ালেখা করিও। জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে— এ কথাটি বিশ্বাস করিও। তবে মনে রাখিও, আমাদের দেশে জ্ঞান মুক্তি দিলেও চাকরি দেয় না। আর চাকরি না থাকিলে স্বাধীনতার স্বাদ মাসের শেষে বাড়িভাড়ার নোটিসে তিতা হইয়া যায়।
ইতি
তোমার অগ্রজ একজন শিক্ষিত বেকার



