আগামীর চোখ
উল্টাপুরাণ

শ্রদ্ধেয়
আব্বাজান,
আপনার পুত্রদায় আমার বেকারত্বের চেয়েও প্রাচীন। আমি চাকরি পাইনি, আপনি পুত্রবধূ পাননি— এ দুই ব্যর্থতার মাঝখানে আমাদের সংসারে যে দীর্ঘশ্বাস, তার একমাত্র উপার্জন হতাশা। পাড়া-প্রতিবেশী আমার বিয়ের বয়স গোনেন, আত্মীয়স্বজন আপনার কপালের ভাঁজ গোনেন। আর আমি গুনি, বিয়ের পর কোন কোন বিপদ আসতে পারে, তার তালিকা।
খবরের কাগজে পড়লাম, যৌতুকের মামলায় স্বামীরাও বাদী হচ্ছেন, স্ত্রীরা হচ্ছেন আসামি। এতদিন জানতাম, যৌতুক হলো কনের বাপের পকেট থেকে বরের পকেটে সম্পদ স্থানান্তরের একটি ঐতিহ্যবাহী সেতু। এখন দেখছি, সেতুটি দ্বিমুখী। নারী কেন যৌতুক প্রাপ্তিতে পিছিয়ে থাকবে? পুরুষই বা একা যৌতুকের সুবিধাভোগী হবে কেন? যৌতুকের বাজারে নারীর অংশীদারি থাকবে না?
এতদিন মেয়ের বাবা বিয়ের আগে জমি বিক্রি করতেন, ঋণ করতেন, গয়না বন্ধক রাখতেন। এবার ছেলের বাবাও প্রস্তুতি নেবেন। অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কেবল একটি ছোট্ট সমস্যা— এই সাম্যের নাম যৌতুক, আর এর গন্তব্য আদালত। পুরুষতন্ত্রের পুরনো দোকানে এবার নারীরাও ক্যাশ কাউন্টার খুলবেন; ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই মামলা করার অধিকার নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। সংসারে ভালোবাসার ঘাটতি থাকুক, আইনি অধিকারের ঘাটতি থাকবে না!
তবে আমার বিপদটা অন্য জায়গায়। আমি বেকার। পকেটে যৌতুক দেওয়ার টাকা নেই, নেওয়ার যোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ আছে। পাত্রীপক্ষ যদি বলে, ‘ছেলে কী করে?’ আপনি কী উত্তর দেবেন? স্ত্রী যদি বলেন, তার ভাইকে বিদেশ পাঠাতে পাঁচ লাখ টাকা চাই; আমি যদি বলি, নিজের ভবিষ্যৎটাই এখনো দেশান্তরী, তখন কী হবে?
এতদিন জানতাম, যৌতুক হলো কনের বাপের পকেট থেকে বরের পকেটে সম্পদ স্থানান্তরের একটি ঐতিহ্যবাহী সেতু
অবশ্য আইন বলছে, যৌতুক দাবি করলে নারী-পুরুষ কেউই ছাড় পাবেন না। কিন্তু আব্বাজান, আইনের চোখে সমতা আর সমাজের চোখে সমতা এক জিনিস নয়। যৌতুকের কারণে মেয়ের গায়ে আগুন লাগলে আমরা জানি, সেটি অপরাধ; ছেলের ওপর আর্থিক চাপ এলে সেটিও অপরাধ। আবার মিথ্যা মামলায় কাউকে ফাঁসানো হলে তার বিচার চাই; কিন্তু সেই অজুহাতে সত্যিকারের নির্যাতনের শিকার নারীর কান্নাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
আমার বিয়ের ব্যবস্থা করার আগে একটা চাকরির ব্যবস্থা করুন। যদি যৌতুকের বাজারেই আমাকে নামাতে চান, তবে দুই পক্ষের আর্থিক দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপিত হবে; ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মানবিকতা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক।
আব্বাজান, আমার জন্য পাত্রী দেখুন, বিনিয়োগকারী নয়। সংসার গড়তে চাই, যৌথ লিমিটেড কোম্পানি নয়। আপনার পুত্রদায় ঘুচুক। আমার বিয়ের ফুল ফুটুক।
ইতি
আপনারই পুত্র



