বর্ষাকালের কাছে লেখা দ্বিতীয় চিঠি

ছবি: এআই
এই চিঠিটা বর্ষাকালের কাছে লেখা দ্বিতীয় চিঠি। তাহলে প্রথম চিঠি কে লিখেছিল? সে তো লিখেছিলেন কবি কালিদাশ এখন থেকে প্রায় ‘ষোল শ’ বছর আগে। আর তৃতীয় চিঠিটা ভবিষ্যতের কোন বর্ষাকালের ডাকবাক্সে পৌঁছাবে তা বলা শক্ত।
বৃষ্টি ঝরছে। কখনো অবিশ্রান্ত, কখনো ঝিরঝির করে। আকাশ এক ধূসর খামের মধ্যে গুটিয়ে ফেলেছে সব আলোর রেখা। গাছপালাগুলো আবিশ্রান্ত বর্ষণে ভিজে গিয়ে জবুথবু। বৃষ্টি পেয়ে পাতার শরীরে চকচক করছে সবুজ অন্ধকার। কোথাও ছাতা মাথায় পথ চলতে চোখে পড়ে ফুটেছে রক্তজবা আর স্পাইডার লিলি। বর্ষায় বাঙালির ইলিশ মাছ আর খিচুড়ি তত্ত্ব প্রায় ব্যর্থ এখন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন জলের উজ্জ্বল শস্য ইলিশ। সেই শস্য এখন অগ্নিমূল্য হয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বৃষ্টিতে পাহাড় ভেঙে ধস নামছে, তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গ্রামগঞ্জের অসহায় মানুষ। রাজধানীতে বৃষ্টির জমা জল দখল নিয়েছে রাজপথ আর গলির। জীবন থমকে গেছে ভারী বর্ষণে। এরকম সময়ে বর্ষার মেঘের প্রতি লেখা প্রথম চিঠির খোঁজ কে রাখে, কে পড়বে দ্বিতীয় চিঠি? তবুও এই গভীর বৃষ্টি কোথায় যেন উড়িয়ে নিয়ে যায় আমাদের মন। ধূসর অতীত থেকে উঠে আসে পুকুরে ছিপ ফেলে বসে থাকা ছায়ামূর্তি, বাইরের উঠানে মাধবীলতার ঝাড়ের তলায় দাঁড়ানো রঙচটা একলা সাইকেলের আঁকা আলস দিনের ছবি। এমন বৃষ্টির দিনে কে সাইকেল চালিয়ে যায় গ্রামের বাজারে? চায়ের দোকানে জমা অন্ধকার দিন শরীরে মেখে কে বসে থাকে? কে ভুলে যায় ওষুধ কেনার কথা? তখন আকাশ থেকে নেমে আসা জলের অজস্র চূর্ণকণা দেখতে ইচ্ছে করে শুধু। দিগন্তে টেনে দেওয়া বৃষ্টির ধূসর পর্দার দিকে আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না।
দুধের ঘটি ঘুমিয়ে আছে ওষুধের দোকানের বারান্দায়। খড়ের গাদা ভিজে যাচ্ছে অফুরান বৃষ্টিতে। ভিজছে মন্থর খালে মাছের আশায় পেতে রাখা কারও জাল। এরকম দিন কোথাও নিয়ে যায় না কাউকে। শুধু বসে নিমগ্ন বসে থাকার ভঙ্গির ভেতরে প্রবাহিত হয় যেন একটা জীবন। সে জীবনের কোনো চাওয়া নেই, ভোরবেলা ঘুম ভেঙে উঠে ভাড়া করা বাহন পাওয়ার দৌড় নেই, ব্যস্ত ফোন নেই, ভারী কাচের জানালায় বৃষ্টির ছাঁট উপেক্ষা করে জরুরি মিটিং নেই।
শহুরে জীবন শক্ত নিগড়ে বাঁধা। আজকাল শহরের ঘরবাড়িতে কোনো ভেন্টিলেটার নেই। তবুও এই বর্ষায় কেউ আকাশ দেখার স্বপ্ন দেখে হয়তো। সে আকাশ তাকে ছাতা ছাড়াই গভীর বৃষ্টিতে পথে বের হওয়ার স্বপ্ন দেখায়। আকাশ তাকে বলে আজ কোনো কাজ নেই। বাঙালির অভিধানে গুলতানি শব্দটা বোধ করি অন্য ভাষার অভিধানে এতটাই অকর্মক নয়। ইংরেজরা বলে, ‘গসেপিং’। আরেকটু আধুনিক করে বললে বলা যায় ‘চিট-চ্যাট’। এসব শব্দবন্ধে সাহেবীআনার চাল আছে কিন্তু মনটা অনুপস্থিত বলে মনে হয়। বাইরে বৃষ্টি আর ঘরের ভেতরে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসে সর্ষের তেল মাখা মুরগি আর গরম চায়ের অলস অবসর পৃথিবীতে আর কোথায় মিলবে? অফিসে কাজের সমুদ্র থেকে আলতো করে নিজেকে খসিয়ে নিয়ে কোনো বৃষ্টির দুপুরে কে নিজেকে তাড়িয়ে নিতে পারে নিভৃতিতে? বর্ষার তুমুল বৃষ্টির দিনে শার্টের বুক পকেটে একশ কাজের ফর্দকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস বাঙালি ছাড়া আর কারও নেই।
কবি আবুল হাসান কবিতায় লিখেছেন, ‘প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হয় তোমার পায়ের পাতার শব্দ।’ আবার কবি আবিদ আজাদের কবিতায়, ‘বৃষ্টি নামে টাপুরটুপুর/ বৃষ্টি নামে টাইপরাইটারের শব্দে মতিঝিলে।’ বৃষ্টি জানালার কাচের গায়ে স্নিগ্ধ ছবি আঁকে। সেই ছবি দেখতে দেখতে কোনো নাগরিক ভুলে যায় জীবন তাকে তাড়া করে ফিরছে এই নিষ্করুণ শহরে। তার ব্যক্তিগত চশমার কাচে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি জমা হয়ে তৈরি করে অচেনা সমুদ্দুর।




