যারা শহরকে বাঁচিয়ে রাখে, তাদের আমরা চিনিই না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আচ্ছা, ভেবে দেখেছেন, শেষবার কবে আপনি কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে সালাম দিয়েছেন? কুশল বিনিময় করেছেন? বাদ দেন। কোনো নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলেছেন? তার খোঁজখবর নিয়েছেন? সেটাও বাদ দেন। তাহলে আপনার বাসার গৃহকর্মী। উনার নামটা আপনি জানেন সম্ভবত। কিন্তু উনাকে কি কোনো দিন জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘আপনি কেমন আছেন?’
কত সহজ প্রশ্ন, অথচ কেমন যেন কঠিন। মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে না। অথচ উল্টো দৃশ্য কল্পনা করুন। কোনো বড় কর্তা যদি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, আপনি তাকে ঢুকতে দিতে দ্বিধা করবেন? ভদ্রলোককে চেনেন না বলে কি ফিরিয়ে দেবেন? না। বরং দরজা খুলে দেবেন, আসন পেতে দেবেন, জিজ্ঞাসা করবেন চা নাকি কফি। কেন এই ব্যবধান? কারণ ছোট্ট একটি সত্য- যাদের কাজ ছাড়া সমাজ একদিনও চলে না, তাদের পেশার সামাজিক মর্যাদা একেবারেই নিচের দিকে।
আমরা কি কখনো লক্ষ্য করেছি, রাস্তা পরিষ্কার না থাকলে শহর অচল হয়ে যেত। নিরাপত্তাকর্মী না থাকলে অফিস, ব্যাংক, স্কুল- সবকিছু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেত। গৃহকর্মীরা না এলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীরা কি করে চাকরি করতেন, ঘর সামলাতেন? অথচ আমরা যাদের ওপর এত নির্ভরশীল, তাদের সঙ্গে ব্যবহার করি পণ্যদ্রব্যের মতো। নাম জানি না, পরিচয় জানি না, কত দিন ধরে এই কাজ করছেন, সেটা জানার কথাও ভাবি না। আমরা জানি, আমাদের বাসার কুকুরটির নাম কিংবা গাড়ির মডেল কোন বছর বেরিয়েছিল, কিন্তু যিনি আমাদের টয়লেট পরিষ্কার করেন, তার কটি সন্তান, তা আমাদের অজানা।
এই বৈষম্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু খুব গভীর। মনে করুন, কোনো পরিচিত আত্মীয় যদি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরি নেন, তাঁর সম্পর্কে আমরা কেমন ভাবি? ‘অভাগা, লেখাপড়া জানা সত্ত্বেও কী কাজ নিল?’ আর একই আত্মীয় যদি ব্যাংকের অফিসার হন, তখন আমরা গর্ব করি। প্রকৃতপক্ষে, কাজের জরুরিতার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদার তফাৎ আকাশচুম্বী। এ যেন এক বিচিত্র গণিত, যেখানে সমাজের ভিত্তি যারা বানাচ্ছেন, তাদের ‘দাম’ দিচ্ছি সবচেয়ে কম।
এখন প্রশ্ন হলো, এই মানসিকতা বদলানো কি সত্যিই সম্ভব? সম্ভব, কিন্তু দরকার স্বাভাবিক কিছু আচরণ। সালাম দেওয়াটা বড় কিছু না। জিজ্ঞাসা করা, ‘কেমন আছেন?’ এতে কারও পতন হয় না। বরং শেকল কিছুটা হলেও আলগা হয়। আমাদের বাসার গৃহকর্মীর সন্তান কি স্কুলে যায়? নিরাপত্তাকর্মীর বৃদ্ধ বাবা-মা কী ভাবে আছেন? পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কি স্বাস্থ্যসমস্যা আছে? এ সব জানা মানে তাঁদের মানুষরূপে দেখা। আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মানে প্রথম নাম ধরে ডাকা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা, এক কাপ চা খাওয়ার আমন্ত্রণ। তাতে পেশার তারতম্য থাকে না, থাকে স্রেফ সহমর্মিতা।
সমাজ বদলানোর দায় কিন্তু সরকার বা আইনের একার নয়। সেটা শুরু হয় আমাদের নিজের বারান্দা থেকে, গেট থেকে, রান্নাঘর থেকে। আজ যখন এই লেখা পড়ছেন, আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী এসেছেন, কিংবা অফিসের সেকিউরিটি গার্ড যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, একবার তাকে জিজ্ঞাসা করুন, ‘আপনি কেমন আছেন?’ নাম জানতে চান। হয়তো উত্তর পাবেন একটু অবাক করা হাসি। সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক নতুন সম্পর্কের শুরু। সেই সম্পর্কই একদিন বৈষম্যের দেয়াল ভাঙবে। যারা সত্যিই শহরকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাদের হাসি ফেরানো কি আমাদের দায়িত্ব নয়?



