মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ আর দেখবে না বিশ্ব
- বিশ্বকাপের আগে ‘ব্যালন ডি’অর’ ওয়েবসাইটে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি-রোনালদো নিয়ে কথা বলেছেন বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন তারকা আনহেল দি মারিয়া

প্রশ্ন: বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসছে এবং এই প্রশ্ন করা এড়ানো যাচ্ছে না: আপনার কি সেখানে থাকতে ইচ্ছা করে না?
দি মারিয়া: না, সত্যি বলতে একদমই না। আমি যখন আর্জেন্টিনা দল থেকে অবসর নেওয়ার (আর না ফেরার) সিদ্ধান্ত নিই, তখন প্রথম দু-একটা স্কোয়াড ঘোষণার সময় মনের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল। সিদ্ধান্তটা আমি নিজেই নিয়েছিলাম। তবুও দলে নিজের নাম না দেখে একটু অদ্ভুত লাগছিল।
প্রশ্ন: এই নতুন ভূমিকায় আপনি কি খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন?
দি মারিয়া: আমার যাওয়ার ইচ্ছা আছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি। আমাকে এখানে (ক্লাবে) আমাদের সূচি দেখতে হবে— কবে আমাদের খেলা শেষ হচ্ছে এবং কবে আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে। আমার ছুটির সময়টা দেখতে হবে... তবে অবশ্যই আমি যেতে চাই।
প্রশ্ন: রিয়াল মাদ্রিদে আপনি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে খেলেছেন। আবার লিওনেল মেসির মতো আরেক কিংবদন্তির সঙ্গেও খেলেছেন। এই দুজনের মধ্যে আপনি কীভাবে তুলনা করবেন?
দি মারিয়া: ক্রিস্তিয়ানো ছিল কঠোর পরিশ্রমের এক খাঁটি উদাহরণ, দিন-রাত নিয়মতান্ত্রিক খাটুনি... লিওর (মেসি) সমকক্ষ হওয়ার জন্য সে সবসময় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিত। আর লিও ছিল সম্পূর্ণ জন্মগত প্রতিভাধর, ঈশ্বরের এক অনন্য উপহার। অন্যজন (ক্রিস্তিয়ানো) তার সমকক্ষ হতে এবং কোনো কোনো সময় তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনবরত কঠোর পরিশ্রম করে গেছে। এ কারণেই সে এতগুলো ব্যালন ডি’অর জিততে পেরেছে...। একটা সময় ছিল, যখন মানুষ বিতর্ক করত ব্যালন ডি’অর কি তার পাওয়া উচিত যে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে, নাকি তার যে অন্যজনের চেয়ে বেশি গোল করেছে। পরবর্তী সময়ে দুজনই যার যার নিজস্ব শক্তিতে সমানে সমানে লড়াই করেছে। তবে কঠোর পরিশ্রমের কথা বললে, ক্রিস্তিয়ানো সত্যিই অনন্য ও অতুলনীয়।
প্রশ্ন: এই দুজনের মধ্যে মূল পার্থক্য কী দেখেন?
দি মারিয়া: আমার কাছে এই যুগের ইতিহাসে ওরাই সেরা দুজন, তাই না? অবশ্যই দিয়েগো ম্যারাডোনাও আছেন... তবে লিও ক্রিস্তিয়ানোর চেয়ে সেরা। কারণ তার প্রতিভা জন্মগত; কাউকে ছোঁয়ার বা কারও সমকক্ষ হওয়ার জন্য তাকে অনবরত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয় না। দুজনের সঙ্গেই আমার চমৎকার সম্পর্ক ছিল এবং আমি দুজনকেই গোল করতে অ্যাসিস্ট করেছি। এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা ছিল।
প্রশ্ন: এই বিশ্বকাপের বছরে আপনার কি মনে হয় তাদের দুজনের কেউ ব্যালন ডি’অর জিততে পারে?
দি মারিয়া: তবে দিনশেষে মেসি বা ক্রিস্তিয়ানোর সেই আগের সময়টা আর নেই, ওটা ফুরিয়ে এসেছে। আমার মনে হয় না ফুটবল ইতিহাসে আর কখনো এমন অসাধারণ কোনো দ্বৈরথ দেখা যাবে। এ কারণেই আমি মনে করি, তাদের মধ্যে কেউ যদি বিশ্বকাপ জেতে বা টুর্নামেন্টে প্রধান ভূমিকা পালন করে, তবে তাদের ভালো একটা সুযোগ থাকবে...
প্রশ্ন: এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলকে কেমন দেখছেন?
দি মারিয়া: আমার মনে হয় নতুন প্রজন্ম দলের পুরনো খেলোয়াড়দের, যাদের বয়স এখন ২৮ বা ২৯ বছর এবং যারা এখনো খুব বেশি বুড়ো হয়ে যায়নি— দারুণ একটা পুশ বা অনুপ্রেরণা দিতে পারবে। এই তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু দিতে পারে, কারণ তারা ক্ষুধার্ত। দলে একমাত্র নিশ্চিত স্টার্টার হলো মেসি। বাকিরা খেলবে কি খেলবে না, তা পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে। আর স্কালোনি তা শুধু মুখে বলেননি, কাজেও করে দেখিয়েছেন। দলে কারও জায়গাই নিশ্চিত নয়। আর এর মানে হলো, দলের ভেতরকার প্রতিযোগিতা বা দ্বৈরথ প্রতিটি অনুশীলনে, ক্যাম্পে, পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গায় শতভাগ বজায় থাকে। এটিই জাতীয় দলকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ জেতার দৌড়ে আপনি কোন কোন দলকে এগিয়ে রাখবেন?
দি মারিয়া: ইদানীং নতুন কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসায় বেশ কয়েকটি দল এই দৌড়ে যোগ দিয়েছে...। ফ্রান্স অন্যতম দাবিদার। কারণ, তারা অনবরত ভালো খেলোয়াড় তৈরি করছে এবং শীর্ষ স্তরে রয়েছে। আর আমার মনে হয় স্পেনও চমক দেখাতে পারে; তারা দারুণ ছন্দে আছে। পর্তুগালও ভালো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া শক্তিশালী দল।
প্রশ্ন: আপনি প্রতিটি ফাইনালে গোল করেছেন। নিজেকে কি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় মনে করেন?
দি মারিয়া: অবশ্য এটি আমার মুখে বলা সাজে না। তবে যখন শুনি মানুষ আপনাকে ইতিহাসের সেরাদের পোডিয়ামে (মঞ্চে) রাখছে, তখন বুকটা গর্ভে ভরে ওঠে। ইতিহাসে নিজের নাম লেখানোর জন্য আপনি আপনার সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটি কেবল খেলে যাওয়ার জন্য খেলা নয়। জীবন আমাকে সবকিছু দিয়েছে। কারণ আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি এবং আমি এভাবেই খেলেছি। আর আজ যদি আমি ইতিহাসের সেই পোডিয়ামে স্থান পেয়ে থাকি, তবে তা আমি নিজের যোগ্যতায় অর্জন করে নিয়েছি।
প্রশ্ন: বিশ্ব এবং ভক্তরা আনহেল দি মারিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে?
দি মারিয়া: ঠিক যেমনটা আমি এখন আছি, তেমনটাই। সেই একই বিনম্র, শান্ত ছেলেটি; যে ফুটবল খেলতে ভালোবাসে এবং পায়ে একটা বল পেলেই সুখী থাকে। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।




