তিনি এই অঞ্চলের একটা চিত্রভাষা উপহার দিয়েছেন: আমিরুল রাজিব

রঘু রাইয়ের সঙ্গে। ছবি: আহাদুল সিরাজ, ঢাকা ২০২৪
রঘুনাথ রায় চৌধুরী বা রঘু রাই (১৮ ডিসেম্বর ১৯৪২–২৬ এপ্রিল ২০২৬) একজন কিংবদন্তি ভারতীয় আলোকচিত্রী। সদ্য প্রয়াত রঘু রাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ দুই দশক সাক্ষাৎকার, আলাপচারিতা ও সম্পাদনা কাজে যুক্ত ছিলেন আলোকচিত্রী, কিউরেটর ও শিল্প ইতিহাসবিদ আমিরুল রাজিব। দিকপাল এই আলোকচিত্রীর প্রয়াণ দিনে দুনিয়াদারি আর্কাইভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আমিরুল রাজিবের সঙ্গে আগামীর সময়ের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ব্যক্তি রঘু রাইয়ের নানান দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী।
আগামীর সময়: যতটা জানি রঘু রাইয়ের সাথে আপনার একটা ব্যাক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ ছিল, তার কাছে ওয়ার্কশপ করেছেন, তার ইন্টারভিউ করেছেন, দেশে-বিদেশে বেশ কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ হইছে, মুভ করছেন- সব মিলে আপনার রঘু রাই এক্সপ্লোর কেমন?
আমিরুল রাজিব: রঘু রাইয়ের সাথে আমার ইন্ট্রোডাকশনটা খুবই অদ্ভুতÑ১৯৯৯ সালে আমার ফটোগ্রাফির শুরুর দিকে, তখন ওনার ‘কলকাতা’ নামে একটা বই আর ‘বোম্বে’র উপর দুইটা বই হাতে পাইছিলাম। তো তরুণ আলোকচিত্রী হিসেবে এটা খুবই অবাক করা বিষয় ছিল যে, এই রকম কম্পোজিশন, একই ফ্রেমের ভিতরে এত ধরনের জিনিস, এত মাল্টিলেয়ারড...। আমাদের এই অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ভিতরে তো এক ধরনের আধ্যাত্মবাদ থাকে, বোহেমিয়ান জীবনাচার থাকে... তারপরে দর্শনগত কিছু জায়গা এবং নন্দনের কিছু মিশ্রণ থাকে... তো সবকিছুরই দেখলাম যে একটা খুবই অদ্ভুত মিশ্রণ এবং সেটা ফটোগ্রাফির মাধ্যমে। মানে সেটা পেইন্টিং না, ওইটা অনেক কিছুকে ছাপায় ওঠার একটা অনুভূতি দিচ্ছিল। তো বলা যায়, ওনার সাথে বইয়ের মাধ্যমেই আমার প্রথম দেখা। তারপরে যখন আমরা পাঠশালায় ছিলাম, তখন ২০০৩-২০০৪ সালের দিকে একটা বড় বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় আসেন। আমরা যখন শুনলাম উনি আসবেন, তখন আমি একটা সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। ততদিনে মোটামুটি তার মেজর কাজ সব দেখা হয়েছে এবং ওনার বইগুলি সংগ্রহ করছি। পাঠশালা লাইব্রেরিতে তখন মাদার তেরেসা, ইন্দিরা গান্ধীর উপরে তার কাজ, বোম্বের কাজ, দিল্লি খাজুরাহের কাজ, ভূপাল ট্রাজেডির কাজসহ অনেক কিছু ছিল। তো মোটামুটি একটা ভালো লাগা থেকেই ওনাকে অনেক কিছু নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধও করেছিলাম তখন। ১৯৭১ সালের ওই সময়টা হচ্ছে নকশালদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে একটা অস্থিরতা। তখন এই বাস্তবতায় তিনি ছবি তুলছেন, আবার পদ্মশ্রী পেলেন। এই পাশে যেরকম মুক্তিযোদ্ধারা মারা গেছেন, ওই পাশে নকশালরা মারা গেছেন। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন তখন ওই পাশে সরকারে। এসব মাথায় রেখে ওনাকে প্রশ্নগুলো খুব সরাসরিভাবে করেছিলাম। উনিও খুবই খোলামেলা ভাবে উত্তর দিয়েছিলেন। ওই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দৃকের বাইরের বাগানে নিয়েছিলাম। শহিদুল আলম তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন, উনি আমাদের সাক্ষাৎকারের সময় সতর্ক হয়ে শুনছিলেন, যদিও ইনটারাপ্ট করেন নাই। অমিতাভ মালাকার নামে একজন আমাদের পড়াতে আসছিলেন, উনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের ছাত্র ছিলেন। উনি আমাদের পাঠশালায় কম্পারেটিভ লিটারেচার পড়াতেন। ছিলেন, কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লার ভাই আলোকচিত্রী আবির আব্দুল্লাহ। ওই সময়টায় আমাদের খুবই রক্ত গরম একটা ব্যপার ছিল, মানে উনার ছবি যে আমরা দেখেছি বা পড়েছি বা বুঝতে পারছি এরকম একটা বিষয় আমাদের মধ্যে কাজ করছিল। আমরা খুব বুঝাতে চেয়েছিলাম যে, আপনার ছবি আমরা খুব মন দিয়ে দেখছি। মানে কি বলব, একটা আবেগ ছিল আরকি সাক্ষাৎকারের সময়। আমাদের এই সাক্ষাৎকারটা অনেক দীর্ঘ সময় চলে, উনি একটু ক্লান্ত হয়ে গেছিলেন। আমার যতটুক মনে পড়ে, আমাদের সাক্ষাৎকারের জন্য ওনার নির্ধারিত সভাটা বোধ হয় এক ঘন্টা পিছায়ে গেছিল।
আগামীর সময়: ওই ইন্টারভিউতে আপনার বিশেষ কোন ফাইন্ডিংস আছে? মানে আপনাদের তো রঘু রাই নিয়ে একটা রিডিং ছিল, ইন্টারভিউতে দেখা গেল অন্য এক ব্যাখ্যা আসল?
আমিরুল রাজিব: পাঠশালা তখন ডকুমেন্টারি প্রধান স্কুল ছিল। আমি যদিও প্রশ্নটা উনাকে আবার ২০১৬ সালে সাক্ষাৎকারের সময় করছিলাম উনি তখন খুবই স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন ওনাকে যখন আমরা প্রশ্ন করতেছিলাম তখন আমরা দেখতাম যে ওনার ছবি অনেক এস্থেটিক। ছবিতে দেখা যায়, জারের মধ্যে বাচ্চাগুলো যারা মারা গেছে মাতৃগর্ভে। তো বীভৎসতা যে কী ধরনের হইতে পারে আর সেটা জার্নালিজম না পিওরলি আর্ট এরকম একটা সংকট হয়তো আমাদের ছিল! যদিও এই সংকট আমাদের এখন অনেকটাই কেটে গেছে, এখন বিষয়গুলো কিছুটা বুঝতে পারি। তখন আসলে ফটোগ্রাফি ডকুমেন্টারি নাকি ফটোগ্রাফি আর্ট- এই প্রশ্নটা প্রবল ছিল। উনি এটা ২০১৬ সালের সাক্ষাৎকারে খুবই ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, উনি আসলে মনে করেন না যে ফটোগ্রাফির কোন আলাদা জনরা আছে মানে ওই অর্থে আর কি। ওনার যে স্টাইল উনি এটাকেও খুব আলাদাভাবে দেখেন না। “আমার কাছে ফটো ডকুমেন্টারি বা আর্ট বলে আলাদা কিছু নাই, প্রত্যেকটা ছবি ডেটা কন্টেইন করে”। ওনাকে আমরা এই ছবিগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। উনি স্টেটসম্যানের জার্নালিস্ট ছিলেন, চিফ ফটো জার্নালিস্ট ছিলেন।
আগামীর সময়: ওনার সাথে আপনার যে সময় কাটছে সেইগুলির যদি একটু বর্ণনা দেন, যেমন দিল্লিতেও নাকি ওনার সাথে সময় কাটাইছেন...
আমিরুল রাজিব: ২০১০ বা ২০১২ সালে উনি বেঙ্গল গ্যালারিতে একটা প্রদর্শনীতে আসলেন। তো অনেক ভিড়ের মধ্যে উনি আমাকে ডাক দিলেন। আমি গেলাম, ভাবলাম যে আমাকে চিনবেন না উনি, কিন্তু আমাকে উনি আদর করে মুন্না সম্বোধন করে ডাক দিলেন। সবসময় মুন্না বলতেন। মনে হয় ভারতীয় মানুষজন ছোট বাচ্চাদেরকে মুন্না সম্বোধন করে। আমি সেটা জানতাম না, আমার বাসার ডাক নাম হচ্ছে মুন্না। আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম যে উনি কি করে জানেন এই নাম। আমি একটু অবাক, আমাকে বললেন যে, তুমি তো আমাকে তখন এমন সব প্রশ্ন করেছ যে আমি কিন্তু তোমার উপরে রাগ করছি। কিন্তু ওনার আচরণে রাগের কোনো ভাব নাই। পরে আমাকে বললেন যে ক্যাটালগটা নিয়ে এসো স্বাক্ষর করে দিই। উনি সস্নেহে জানতে চাইলেন- “তুমি কি এখনো সেইরকম পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছো, কথা বলছো? তেমন গভীর সংবেদনশীল ভাবে ছবি দেখছো কিনা?
তারপরে সম্ভবত আমরা দিল্লিতে গেলাম ২০১৬ সালের দিকে। আমার এক কাছের বন্ধু ফিরোজ মার্চেন্ট। ও রঘু রাইয়ের অফিসেই কাজ করতো। আমার আরো এক বান্ধবী ওখানে কাজ করতেন। তো ওইটা ওনার অফিস আর বাড়ির মাঝামাঝি একটা জায়গাতে মেহেরাউলি নামে। দিল্লির সবচেয়ে পুরনো এলাকা। কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকির দরগার পাশেই ওনার বাসা। রঘু রাইয়ের ছবির মতই ওই এলাকা। নিয়মিত যেতাম, ওনার সাথে দেখা হতো তখন। আমার মনে আছে যে, রোহিত ভেমুলাকে নিয়ে একটা কেস নিয়ে বেশ আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। ভারতে দলিত ও উচ্চবর্ণের সমস্যাটা সবসময়ের একটা সমস্যা। রোহিত হায়দারাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে কাস্টের কারণে নিগ্রহের শিকার হন। এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করেন। তো সেটা নিয়ে ভারত জুড়ে একটা বিশাল মুভমেন্ট চলছিল। আমরা সেই আন্দোলনের ছবি তুলতে যাই জন্তরমন্তর।
বাসার কাছে হওয়ায় আমি নিয়মিত রঘু রাইয়ের অফিসে যাই। এডিটিং নিয়ে কথা হয়, ওনার কাজ নিয়ে কথা হয়। তিনি আমাকে বলেন যে তুমি বেশ সাহস করে কথা বলো। অল্প বয়সেই দেখেছি যে তুমি কথা বলো অনেক বিষয়ে এবং কথা বলতে তোমার দ্বিধা নাই। তো আমার ছবি নিয়ে তুমি ক্রিটিক করো, আমার এত বয়স হয়ে গেছে এবং এমন একটা অবস্থায় চলে আসছি যে আমাকে নিয়ে কেউ আসলে ক্রিটিক করে না। আন্দোলন চলার ভিতরে একদিন উনি জানতে চাইলেন, তুমি কোথায় যাবে? বললাম, রোহিতকে নিয়ে র্যালি হবে, জেএনইউতে (জওহরলাল নেহরেু ইউনিভার্সিটি) যাব। তিনি আমাকে বললেন যে, র্যালিটা কিরকম হয় আমাকে একটু বলবে। আমি আসবো ছবি তুলতে। আমরা তো ছোটখাটো ক্যামেরা নিয়ে গেছি। আমরা সেরকম ভালো ছবি তুলি না নিশ্চিতভাবে। উনাকে ফোন দিলাম যখন দেখলাম যে র্যালিটা বিশাল বড়... হাজারো লোক। উনি ১০ কিলোমিটার দূরে থাকেন জেএনইউ থেকে, ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে উনি দেখলাম যে ওখানে চলে আসলেন। উনি তো অনেক লম্বা আর আলখাল্লার মত একটা জিনিস পরতেন। সবার মধ্য দিয়ে উনারে দেখা যায়। তো উনি চলে আসছেন, এসেই প্রথম বললেন যে তোমার ক্যামেরা কোথায়- মুন্না তোমার ক্যামেরা কোথায়? বলে যে, দেখি কি ছবি তুলছো। আমি তো লজ্জায় মানে একেবারে খুবই মিইয়ে গেলাম যে কি দেখাবো! তো উনি আমার ছবি দেখলেন। ওনার একটা অভ্যাস হচ্ছে কোনো কোনো ছবির দিকে তাকিয়ে জিভে কামড় দিতেন, আর কোনো কোনো ছবির বেলায় একটা মুচকি হাসি দিতেন। বন্ধুরা যেরকম করে। তো জেএনইউতে ওনার পাশে পাশে আছি। কিছুক্ষণ ছবি তোলার পরে এসে বলে কি, দেখো তোমার থেকে ভালো ছবি আমি তুলছি। এটা ছিল উনার একটা প্রবণতা। প্রায় ছয়-সাতটা জায়গাতে ওনার সাথে ছবি তোলার একটা সুযোগ হইছিল, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। সবসময় ছবি তোলার পরেই উনি আমাদের ছবিও দেখতেন আর নিজের তোলা ছবিও দেখাতেন। শিশুর মত সারল্য নিয়ে নিজের ছবি ভালো না হলে বলতেন যে, তোমার ছবিটা তো ভালো হলো আমি ছবিটা পেলাম না! আর ওনার ছবি ভালো হলে ওই একদম বন্ধুর মতো করে বলতেন, দেখো তুমি পারো নাই, আমি কিন্তু দেখো কত সুন্দর একটা ছবি তুলছি।
তো ওনার যে বয়স, তাতে যে রোহিত ভেমুলার র্যালিটার কথা শুনে তিনি যে চলে আসবেন, আমি সেটা ভাবি নাই। তারপরে একদিন ইন্ডিয়া গেটের ওইখানে রোহিতের মা আসলেন সন্ধ্যাবেলা। আমরা ওখানে যাচ্ছি, রঘুজি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। উনিও আমাদের সঙ্গী হলেন। ইন্ডিয়া গেটে তখন প্রচুর পুলিশ আন্দোলনকারীদের পুরা ঘেরাও করে ফেলেছে। আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আনন্দ পট্টবর্ধন, যিনি বাবরী মসজিদ নিয়ে সিনেমা বানিয়ে ছিলেন, তাকে আমরা দূর থেকে দেখছিলাম। আনন্দের চুলগুলি সব সাদা। উনি ওখানে ভিড়ের মধ্যে ক্যামেরা চালাচ্ছেন। পুলিশ ওদেরকে ঘিরে রেখেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের অনেককে পুলিশ টেনে বাসে তুলে ফেলছিল। রঘু রাই যখন তার ক্যামেরা নিয়ে ঢুকছিলেন, ওনার একপাশে আমাদের নাঈম উল হাসান আর একপাশে আমি আর আমাদের জেএনইউর ফার্সি ডিপার্টমেন্টের বন্ধু প্রেম কুমার গুপ্ত- আমরা তিনজন। পুলিশ আমাদের ধরলে তো সমস্যা... তাই আমরা ওনার জাস্ট পিছনে পিছনে যাচ্ছিলাম। আসলে উনি এত বড় মাপের মানুষ এবং পুলিশ ওনাকে দেখে মোটামুটি দুই ভাগ হয়ে গেল... ওনার সাথে আমরা পুলিশ কর্ডনের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়লাম। সেখানে অনেক সাংবাদিক ছিলেন, আমরা দাঁড়াবার জায়গাই পাচ্ছিলাম না।
উনি যেয়ে খুব মিষ্টি করে আনন্দ পট্টবর্ধনকে বললেন, “আনন্দ, থোড়াসা স্পেস মিলেগা...?” আমার এখনো মনে আছে এবং আনন্দ পট্টবর্ধন শ্যুটিংরত অবস্থায় বললেন, শিওর! তিনি জায়গা করে দিলেন। রঘু রাই ওখানে জাস্ট মিনিট খানেকের মধ্যে বেশ কিছু ছবি তুলে আমাদেরকে বললেন, “বাচ্চো, লেটস মুভ ফ্রম হিয়ার”। একটা গোলমাল হয়ে যাবার সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠছিল। আমার ক্যামেরাটা ডিস্টার্ব করছিল, আমি মোবাইল দিয়ে কয়েকটা ছবি তুলেছিলাম একটা ছবি হয়তো ইন্সটাগ্রামে আছে। ওখান থেকে এসে আমাদের ছবি দেখলেন। কিন্তু পরে সেখানে তোলা রঘু রাইয়ের ছবি দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম- এত কম আর দ্রুততম সময়ে এমন চমৎকার ছবি! এরকম কম্পোজিশনের ছবি এরকম টেন্সড একটা মোমেন্টে কিভাবে বের করে আনা সম্ভব! ওনার বোধহয় তখন একটু সুগার প্রবলেম চলতেছিল। একটা আইসক্রিমওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে। বললেন যে দেখো আমি ইন্ডিয়া গেটে এলে নিজেকে সামলাতে পারি না। তো আসো আমরা আইসক্রিম খাই। কিন্তু কখনোই গুরমীত এবং মেয়ে অভনিকে যেন এই আইসক্রিম খাওয়ার কথা না বলি, সতর্ক করে দিলেন। সেখান থেকে বের হয়ে নাঈম আর প্রেম কুমারকে একটা বাসে উঠিয়ে দিলাম। আমি উনার গাড়িতে করে ফিরছিলাম, আমরা একই এলাকায় থাকি। ফেরার পথে উনি সেখানে তোলা ছবির খুঁটিনাটি বারবার দেখছিলেন আর আমাকে বললেন যে, তুমি বলেছ ক্যামেরা নষ্ট, কেন তোমার ক্যামেরা নষ্ট হবে? এরকম একটা জায়গায় আসবা তুমি ক্যামেরাটা চেক করো নাই কেন? তোমার এক্সট্রা ক্যামেরা নাই কেন, রাজিব, অ্যায়সে নেহি চালেগা...। মানে উনি খুবই বিরক্ত হয়ে গেলেন যে মোমেন্টাম অনুযায়ী আমি কেন এখানে ছবি তুলতে পারলাম না! এই যে একটা মানুষের সিরিয়াসনেস এবাউট ফটোগ্রাফি, এটা খুবই অদ্ভুত আর কি, মানে এমন বয়সে। আমার ক্যামেরা ঠিক নাই এটা নিয়ে তাঁর মন মেজাজ ঠিক নাই...!
আগামীর সময়: আপনি তো সেখানে মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছিলেন। মোবাইল ফটোগ্রাফি নিয়ে ওনার মনোভাব কী ছিল?
আমিরুল রাজিব: হ্যাঁ, এগুলো নিয়ে আলাপ হইছে। উনি একটা মোবাইল কোম্পানির সাথে কাজ করেছিলেন এবং আমি যতটুকু জানি ওই মোবাইল দিয়ে তোলা ছবি নিয়ে ওনার একটা বইও আছে। এবং দেখে বোঝার উপায় নাই সেটা মোবাইল দিয়া তোলা। তো আমার সেটা নিয়ে কোন বিস্তারিত নিয়ে আলাপ হয় নাই। উনি সাধারণত নাইকনের ডিজিটাল ক্যামেরা ইউজ করতেন। ডিজিটালে কনভার্টেড হয়েছিলেন অনেক আগেই। ওনার মনে হয় না এগুলো নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যথা ছিল। কিন্তু ডেফিনেটলি উনি যেহেতু ক্লাসিক টাইমের মানুষ এবং উনি নেগেটিভ এবং প্রিন্ট অবশ্যই ভালোবাসতেন। আমার যতটুকু মনে পড়ে একদিন আমাকে বলছিলেন যে, ডিজিটালে তেমন মজা লাগে না। কিন্তু এসব নিয়ে উনি খুব অর্থোডক্স ছিলেন না, ডিভাইস নিয়ে তিনি বেশি চিন্তিত ছিলেন না।
আগামীর সময়: রঘু রাইকে তো বাংলাদেশের মিডিয়াতে মুক্তিযুদ্ধের ছবি তোলার জায়গা থেকেই তুলে ধরা হয়। তাঁর ফটোগ্রাফি জীবনে মুক্তিযুদ্ধের ছবির ভূমিকা কতটা তা কি আলাপে উঠে আসছে আপনার সাথে?
আমিরুল রাজিব: মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অনেক বড় ইভেন্ট। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে কারো সাথে রিলেট করতে পারি- সেটাই আমরা আসলে তুলে ধরবো, এটা খুবই স্বাভাবিক। আমার সাথে এটা নিয়ে ইন্টারভিউতে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। কিন্তু আমি বলতে চাই ওই জায়গাটা থেকে- আমার কাছে মনে হয় যেকোনো মানুষকে যখন আমাদের দেশের দর্শকের সামনে মিডিয়া এনে হাজির করে তখন তাদের কোন একটা লিংক লাগে; কোন একটা যোগাযোগ লাগে। তো স্বাভাবিকভাবেই রঘু রাইয়ের সাথে মুক্তিযুদ্ধ এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত, প্রসঙ্গত আসবেই। কিন্তু আবার যদি বলি রঘু রাইয়ের মুক্তিযুদ্ধের ছবি তোলা নিয়ে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কোন লেখা বাংলাদেশের মিডিয়াতে দেখা যায় না। আলোকচিত্র নিয়ে খুব আবছাভাবে কথা বলে বাংলাদেশের মিডিয়া। আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে কেউ ঐভাবে এখনো পর্যন্ত তেমন ডিল করতে পারেনি বা করে নাই।
আমি ওনাকে ১৬ সালে যে ইন্টারভিউটা করেছিলাম, তখন খুবই আবেগ আপ্লুত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সময় ছবি তুলেছেন, এরপরে বাংলাদেশে অনেকবার গেছেন আর এখন বাংলাদেশের যে উন্নতি দেখছেন... তাতে আপনার কি মনে হয়? উনি বলছিলেন যে, বাংলাদেশ তখন এত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, এত দারিদ্র পীড়িত ছিল...। আমি ওনাকে থামিয়ে জানতে চাইলাম, এখন তো আর তেমন নাই বাংলাদেশ, এখন কেমন দেখছেন? উনি আমার দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলতেছিলেন যে, “দেখো, মন্দ কাজে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ আমরা সবাই এক। স্বাধীনতার এত দিন হয়ে গেল, কিন্তু এখনো দেখবে গাছপালা, পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতি আমরা উদাসীন ও নির্মম। গণতন্ত্রকে আমরা শুধু দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছি। তাই তোমাকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর আমি দিতে পারছি না।
আগামীর সময়: বাংলাদেশে রঘু রাইয়ের চর্চা কেমন?
আমিরুল রাজিব: উনি শেষবার বাংলাদেশে আসছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে একটা প্রদর্শনীতে যোগ দিতে। উনি তিনদিন বাংলাদেশে ছিলেন। তো ওই প্রদর্শনীটা খুবই ঘেরাটপের মধ্য দিয়া হয়েছিল। এবং যে বইটা বের হয়েছিল সেটার এত দাম বেশি ছিল যে, আমরা গবেষকরাও কিনতে পারি নাই। উনি নাস্তার টেবিলে আমাকে বলছিলেন যে এইরকম একটা বিষয়ে এরকম একটা প্রদর্শনী বা এরকম একটা বই... এটা আরো বেশি পাবলিক হওয়া উচিত ছিল। আসলে রঘু রাইয়ের কাজ নিয়ে আমাদের এখানে অনেক বেশি গবেষণা কথাবার্তা আলাপ হওয়া উচিত।
তাছাড়া, আমরা রিজিওনালি এত কাছাকাছি। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ আমরা তো একই ইতিহাসের সূত্রে গাথা। আলাদাভাবে ভারতীয় আলোকচিত্রী বা মুক্তিযুদ্ধ শুধু এগুলি না দেখে এই বিশাল টেরিটরি নিয়ে উনার পূনাঙ্গ কাজ আমাদের চর্চায় আনা উচিত। আমার মনে হয় রঘু রাই এই অঞ্চলের সামাজিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা চিত্রভাষা উপহার দিয়েছেন। আমাদের সংবাদপত্র বা লেখালেখি বা গবেষণা জগতের অনেকেই মনে করেন যে তারা যেহেতু পড়তে জানেন, তারা নিশ্চয়ই চিত্রভাষাও পড়তে জানেন। তো আমাদের এখানে বেশিরভাগ মানুষই কিন্তু এখনো চিত্রভাষা পড়তে জানেন না। এটাতো নিঃসন্দেহে সত্যি এখনো বাংলাদেশে যথাযথ ফটো এডিটর নাই। সংবাদপত্রের জগতে এখানে নিউজ এডিটররা সিদ্ধান্ত নেন ছবির বিষয়ে। আমি মনে করি যে রঘু রাইয়ের ছবি এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা উনি এই অঞ্চলের মানুষের চিত্রভাষা নির্মাণে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন।
আগামীর সময়: খুব সম্ভবত রঘু রাইয়ের একটা কথা, “পিকচার কামস ফ্রম গড”। তো, রঘু রাইকে কি এঞ্জেল অব ফটোগ্রাফি বলা যায়?
আমিরুল রাজিব: সেটা তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারো। কিন্তু উনি রিলিজিয়াস ছিলেন না, তবে স্পিরিটেড ছিলেন। ওনার একজন আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন এবং উনি স্পিরিচুয়ালিটিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি পৃথিবীতে সকল দেখা, কাজকর্মকে স্পিরিচুয়ালি গুরুত্ববহ বলে মনে করতেন। সব কিছুরই অর্থ আছে, আর সেটার আধ্যাত্মিক একটা সম্পর্ক আছে। এবং তাঁর ছবির দিকে তাকালেও কিন্তু এরকম একটা স্পিরিচুয়াল ক্যারেক্টারিস্টিক আমরা দেখি। ওনার বেশিরভাগ ছবি দেখলেই তাই মনে হয় যে, এটা কি পরাবাস্তব? এতোগুলো জিনিস ফ্রেমের ভেতর কি করে এলো? পিছনের এমন ব্যাকগ্রাউন্ড কিভাবে আসলো? মানে উনি এই যে একটা মিনিয়েচার অব টাইম কম্পোজ করলেন, ফটোগ্রাফি যে একটা সময়ের মিনিয়েচার... এই যে ডিসাইসিভ মোমেন্টটা ধরতে পারা এবং ইন বিটুইন সবটা দেখতে পারার মধ্যে যে একটা হারমনি আছে... আমি মনে করি যে ওনার সেই মহাজাগতিক সুর ধরার বিশাল এক জাদুকরী ক্ষমতা ও দক্ষতা আছে। যেই আলোকময় দেখাটা সবাই দেখতে পারে না আর কি!উনি বেশিরভাগ বিষয় দৃশ্যভাষার মাধ্যমে দেখতে বলতেন।
আগামীর সময়: আমাদেসময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আমিরুল রাজিব: আপনাকেও ধন্যবাদ।






