সাক্ষাৎকার
মব সমর্থন করিনি কিন্তু নিয়ন্ত্রণের অবস্থা ছিল না

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারের ভেতরে কথিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল কি না— তা জানা নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সীমিত পরিসরে আলোচনা হতো। সেখানে অর্থনৈতিক বিষয় থাকলে উপস্থিত থাকতাম। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিজের নাম আলোচনায় এলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নিতে সম্মত হওয়ার পর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে শেষ হয়ে যায়। সম্প্রতি আগামীর সময়কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকাের এসব কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
প্রশ্ন: আপনার কাছে জানার বিষয়, এখন অবসর সময় কাটাচ্ছেন। এ সময়টা কীভাবে উপভোগ করছেন?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: ঠিক অবসর সময় না, আমি এখন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছি। নিয়মিত কোর্স নিচ্ছি না, তবে আমার কিছু স্পেশাল লেকচার আছে। উপদেষ্টা হওয়ার আগেও ব্র্যাকে ছিলাম, এর আগে নর্থ সাউথে ছিলাম।
প্রশ্ন: যখন ফোন পেলেন উপদেষ্টা হতে যাচ্ছেন, আপনার অনুভূতিটা কেমন ছিল?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: যখন আমাকে সরকার থেকে জানানো হলো, এর আগে তো ইনফরমালি কথাবার্তা হচ্ছিল যে কারা যাবে। আমার ফিলিংসটা— একেবারে আশ্চর্য হয়ে যাইনি। আর প্রফেসর ইউনূসের নামটা তখন চলেই আসছিল। আমি প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে বহু আগে থেকে পরিচিত ছিলাম, অনেক ব্যাপারেই যোগাযোগ ছিল। ভাবলাম, ঠিক আছে, দেশের জন্য কিছু করার একটা সুযোগ পেলাম। তাই যখন তারা বলল যে আমি এখানে উপদেষ্টার দায়িত্ব নেব, খুশি হয়েছিলাম যে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের জন্য কন্ট্রিবিউট করতে পারব।
প্রশ্ন: আপনাকে অনেক কঠোর ও নমনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এমন কোনো অনুভূতি কি এখন কাজ করে যে, অমুক সিদ্ধান্তটি আরেকটু অন্যভাবে নিতে পারলে ভালো হতো?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: নিশ্চয়ই। আমরা তো দেশটাকে একটা সংকটময় মুহূর্ত থেকে বের করে আনার মেসেজ নিয়েই এসেছিলাম। বিশেষ করে, অর্থনীতি এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। দেড় বছরে খুব উন্নতি করে ফেলব তা নয়; বরং অর্থনীতির ক্ষতিটাকে ঠেকানোই লক্ষ্য ছিল। আমরা ব্যাংকিং সেক্টর, রাজস্ব আদায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু সংস্কারের চেষ্টা করেছি। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত ও ব্যবসা-বাণিজ্য উজ্জীবিত করা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সবকিছু যে করতে পেরেছি, তা নয়। যেমন, ব্যবসাকে যেভাবে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি, সেটি পারিনি। কারণ ১৫ বছরে বেশিরভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক, টেলিভিশন চ্যানেল, নিউজপেপার সব ওন করত। অন্যদের জন্য ব্যবসার স্পেস ছিল না, আর বড় ব্যবসায়ীরা ঋণ শোধ করেননি। ব্যবসাটিকে আমরা ঋণ দিয়ে সচলের চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি কি কোনো চাপ অনুভব করেছিলেন?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: কিছুটা। আমাদের নানা রকম অভ্যন্তরীণ ও বাইরের প্রেসার ছিল। অভ্যন্তরীণভাবে পলিটিক্যাল ইস্যু খুব অস্থির ছিল। রাজনৈতিক পার্টিগুলোর অনেক বিষয়ে অনীহা ছিল। তারা বলত, ‘তাড়াতাড়ি নির্বাচন দাও, বেশি সংস্কার করতে যেও না, আপনারা কেয়ারটেকার মোডে থাকবেন।’ তাদের এই আচরণ কিছুটা বাধার সৃষ্টি করেছে। সরকারি কর্মচারীরাও আগে থেকে অ্যালাইনড ছিলেন— কোন পার্টি আসবে, কার সঙ্গে সখ্য রাখলে সুবিধা হবে। এ ছাড়া ওই সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে হার্ড ডিসিশন নিতে হয়েছে। পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করেছি, কিন্তু বাকিগুলোর ব্যাপারে তক্ষনি সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কারণ, একসঙ্গে সব বন্ধ করতে গেলে লোকজনের আস্থা কমে যেত। তাই সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আগে ধরেছি। আর এনবিআর ভাগ করতে গিয়ে প্রশাসন এবং ব্যুরোক্রেসির কাছ থেকেই মূল বাধা এসেছে, যদিও সাধারণ মানুষ এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক চ্যালেঞ্জ ছিল— বাইরে থেকে ঋণ আনা। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগের পরিবেশ ও আস্থা কম ছিল। আমরা সাহায্য পেয়েছি, কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ আসার ব্যাপারে কষ্ট ছিল।
প্রশ্ন: অনেক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে মিটিং করেছেন। সেখানে কোনো স্মৃতি আছে, যা নিয়ে আপনি গর্ব করতে পারেন বা তারা আপনাকে কীভাবে নিয়েছিল?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে যখনই আলাপ করেছি, তারা কঠিন কিছু প্রশ্ন করেছে। যেমন : যেসব সংস্কার করছি, সেগুলোর রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ও ভবিষ্যতের সরকার এগুলো মানবে কি না? উত্তর ছিল, আমরা কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছি না; বরং দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্য কাজ করছি। পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গেও ইনফরমাল আলাপ হয়েছে, তারাও বলেছে এসব সংস্কারে তাদের আপত্তি নেই। ফলে বহির্বিশ্বে আমাদের প্রতি একটা ভালো ইম্প্রেশন ছিল। এ কারণেই দাতা সংস্থাগুলো আমাদের প্রচুর অর্থ দিয়েছে।
প্রশ্ন: ক্ষমতায় থাকাকালে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া আপনাকে কি গভীরভাবে স্পর্শ করত?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: ডেফিনেটলি। মানুষের জীবনযাত্রার মান আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। লোকজন অভিযোগ করত আয় দিয়ে সংসার চলছে না, সেটি খুব বিচলিত করত। আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি না করার ব্যাপারে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। ওই সময় দুটো রোজা গেল, মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র, কৃষকদের সার ও উৎপাদন নিশ্চিত করেছি। সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর জন্য কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টাও করেছি, তবে সীমাবদ্ধতা ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে বা মানুষের ক্ষতি হলেও আমরা বিচলিত হতাম। আমরা চেষ্টা করতাম, কিন্তু সার্বিকভাবে দেশে একেবারে শান্তি বিরাজ করছে, কোনো ডিস্টার্বেন্স নেই, সেটি ছিল না বলে বিচলিত হতাম।
প্রশ্ন: ওই সময় মব ভায়োলেন্স বেশি দেখেছি। এটিকে নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টা কি আপনাদের ছিল?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট না থাকলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে মব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আমাদের সময় প্রতিদিন নানা আন্দোলন হয়েছে। পুলিশ দিয়ে বা জোর করে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থা ছিল না। যেমন : এনবিআরে এক-দেড় মাস তালা লাগিয়ে বন্ধ করে রাখল। পুলিশ পাঠিয়ে এনবিআর খুলে লাভ হতো না, অফিসাররা কাজ করতে পারতেন না। এই মব ভায়োলেন্সের কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের সংস্কারও অনেক বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঠিক আগ মুহূর্তে গুঞ্জন ছিল আপনিই প্রধান হচ্ছেন, পরে পরিবর্তন হলো...
সালেহউদ্দিন আহমেদ: হ্যাঁ, হয়তো প্রশাসনিক ও অন্যান্য অভিজ্ঞতার কারণে কেউ কেউ আমার নাম বলেছিল, যদিও আমি সেটি জানি না। যখন প্রফেসর ইউনূসের নাম এলো, উনি তো অভিজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মানুষ। উনি যখন রাজি হলেন, স্বাভাবিকভাবেই আমার নামটা ব্যাকগ্রাউন্ডে (পেছনের কাতারে) চলে যায়। এতে আমার কোনো আক্ষেপ ছিল না। এ ছাড়া আগেও যখন কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ছিল এক-এগারোতে, তখন কিন্তু ওনাকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। উনি তখন না করেছেন। সে অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছিল এসব ব্যাপারে তিনি এবারও আসবেন না। আমি যখন জানলাম যে আমাকে উপদেষ্টা করা হচ্ছে, আমি খুশি মনেই তা গ্রহণ করেছি।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের মধ্যে কাজের সমন্বয় কেমন ছিল?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমাদের কলিগরা নানা অভিজ্ঞতা ও ধ্যান-ধারণা নিয়ে এসেছিলেন। অনেকের এনজিও বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে অভিজ্ঞতা ছিল, তবে সামষ্টিক অর্থনীতির অভিজ্ঞতা সবার ছিল না। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি পজিটিভ ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বিমত থাকত, কিন্তু একটা কালেকটিভ ডিসিশন বা মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সবাই একমত থাকতাম। কেউ বেরিয়ে এসে বলেনি যে আমি এই ডিসিশনের মধ্যে নেই।
প্রশ্ন: রাজনীতি এবং প্রশাসনের জায়গাটা আপনি কীভাবে দেখেছেন?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: তখন রাজনীতি খুব একটা ছিল না, কিন্তু প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা আচরণ ছিল— কোন পার্টি আসবে আর কার সঙ্গে থাকলে সুবিধা হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রশাসন। আমার মনে হচ্ছে সার্বিকভাবে প্রশাসনের সহযোগিতা ও সক্রিয়তার একটু অভাব ছিল। কারণ একটা জিনিস লক্ষ করবেন, প্রশাসনের লোকজন কিন্তু চেইন, সংস্কার খুব যে পছন্দ করেন তা না। নিজেদের ক্ষমতাটা খর্ব হতে দিতে চান না। অতএব সেখানে আমাদের একটু অসুবিধা হয়েছে।
প্রশ্ন: বর্তমান সরকার প্রশাসনে অনেক পরিবর্তন আনছে। ওই সময় কি কোনো বিশেষ দলের অবস্থান বেশি ছিল বলে এই পরিবর্তনগুলো হচ্ছে?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: ঠিক সে রকম না। আমরা প্রশাসনে খুব একটা রদবদল করিনি। যাদের ব্যাপারে খুব অবভিয়াস ছিল, তাদের রিটায়ারমেন্ট দেওয়া হয়েছে। বিরাট রদবদল করলে আমরা কাদের আনব, অনেককেই তো চিনতাম না। আমরা স্ট্যাটাস বজায় রেখে কাজ করার চেষ্টা করেছি। কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী ছিল, আমরা টের পেতাম। আমরা চেষ্টা করতাম যেন চুপচাপ থাকে। উসকে দেওয়ার চেষ্টা করিনি।
প্রশ্ন: এবার যে বাজেট দেওয়া হলো, এটি কীভাবে দেখছেন?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমরা যে বাজেট দিয়েছিলাম, সেটি সবচেয়ে ছোট ছিল। কারণ, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বুঝে বাজেট করা উচিত, শুধু শপিং লিস্ট করলে হয় না। লোকজনের কাছে জোর করে কর, ফি আদায় করবেন— এটি সম্ভব নয়। আমাদের বাজেটে ব্যয় কমানো হয়েছিল এবং এডিপি ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। আর এবারের বাজেট রাজনৈতিক সরকার দিয়েছে, তাই একটু বড় হয়েছে। এটি প্রত্যাশিত, কারণ রাজনৈতিক সরকারের অনেক ম্যান্ডেট ও প্রতিশ্রুতি থাকে। শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন কতটুকু হবে, সেটি পরের কথা। তারা হয়তো ভাবছে, এক বছরে না হলে পাঁচ বছরে চেষ্টা করবে। তবে আমার মতে, এবারের বাজেটটি জনতুষ্টির জন্য দেওয়া হয়েছে— সবাইকে খুশি করার একটা চেষ্টা। লোকজন খুব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি ঠিকই, তবে আমরা মনে করি এর বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হবে। বাস্তবায়ন না হলে মানুষের মনে আবারও হতাশা আসতে পারে। তাই আমার পরামর্শ হলো, সবগুলো একসঙ্গে করার চেষ্টা না করে অগ্রাধিকার ঠিক করা। এক বছরের জন্য জ্বালানি সমস্যার সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসাকে উজ্জীবিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন— এই চারটি বিষয়ে জোর দেওয়া উচিত। সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় একটু ভালোভাবে সমন্বয় করা দরকার।
প্রশ্ন: অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে আপনি নিজেকে ১০-এর মধ্যে কত রেটিং দেবেন? পছন্দের কোনো অর্থমন্ত্রী আছেন কি, যাকে অনুসরণ করা যায়?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমি নিজেকে হয়তো সর্বোচ্চ ৭ বা ৮ দেব। কারণ, ২০ শতাংশ কাজ আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আর সংস্কারেরও একটা বড় অংশ শেষ হয়নি। পছন্দের অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমি সাইফুর রহমান সাহেবের কথা বলব। আমি তার সঙ্গে কাজ করেছি, আওয়ামী লীগের মুহিত সাহেবের সঙ্গে কাজ করেছি, কেয়ারটেকার সরকারেও কাজ করেছি। সাইফুর রহমান সাহেবের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং শক্ত অবস্থান। রাজনৈতিকভাবে তাকে প্রভাবিত করা কঠিন ছিল। রাজনীতিবিদ বা এমপিরা অনেক সময় চেষ্টা করতেন, কিন্তু তিনি সবসময় আর্থিক দিকটা পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেখতেন। একজন অর্থমন্ত্রীকে এমনই পেশাদার হতে হয়।
প্রশ্ন: ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ভেঙে ফেলাসহ অনেক কিছু ভাঙচুর হলো। প্রশাসন থেকে এসব আটকানোর কোনো প্রচেষ্টা ছিল কি?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: নৈতিকভাবে আমি এ ধরনের মব বা ভাঙচুর সমর্থন করিনি। তবে ১৫ বছরে অনেক কিছুতে বাড়াবাড়ি করা হয়েছিল, এটি তারই একটা রিফ্লেকশন। ৩২ নম্বর পাকিস্তান আমল থেকেই একটা প্রতীকী ছিল। কিন্তু সব জায়গায় একই পরিবারের নামে সবকিছু করার কারণে মানুষের মধ্যে যে আক্রোশ তৈরি হয়েছিল, তারই প্রভাব পড়েছে ৩২ নম্বর বাড়ি এবং বিজয় সরণির ভাস্কর্যের ওপর। যেমন পাকিস্তানে জিন্নাহর নামেই তো বহু কিছু আছে। সেজন্য ওরা তো আর সব রাস্তাঘাট জিন্নাহর নামে করে ফেলেনি। আপনি দেখবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে অনেক কিছু ছিল। নামকরণের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে কিন্তু কেউ আপত্তি করেনি, যেমন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু পরে দেখা গেল সবকিছুই এক নামে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ পছন্দ করেনি। তাই বলে ভেঙে ফেলা যুক্তিসংগত নয়, কারণ সেটি একটা মিউজিয়াম ছিল। এসব ঘটনা হঠাৎ করে এবং খুব দ্রুত ঘটেছে। আকস্মিকভাবে বুলডোজার নিয়ে এসে পরিকল্পনা করেই এগুলো করা হয়েছে, যা আমাদের বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায়। আমরা আমাদের জায়গা থেকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পুঞ্জীভূত আক্রোশের যে ধাক্কা ছিল, সেটি থামানো সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন: দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে চাপ অনুভব করেছিলেন কি?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: হ্যাঁ, অবশ্যই। বড় রাজনৈতিক দলগুলো, যেমন বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী বলত, ‘আপনারা কেন এসব সংস্কার করতে যাচ্ছেন, আপনারা কেয়ারটেকার মোডে থাকেন। ট্যাক্স স্ট্রাকচার ধরবেন না, এগুলো আমরা এসে দেখব।’ তাদের এই চাপ ছিল। কারণ রাজনীতিবিদদের কাছে আবার ব্যবসায়ীরা ধরনা দিতেন। অন্যদিকে মিডিয়া থেকেও পরোক্ষভাবে চাপ আসত। ব্যবসায়ীরা বা রাজনীতিবিদরা মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক কিছু লেখাতেন, যাতে আমরা কিছু কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকি। তবে একদিক থেকে এটা ভালো ছিল। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকা দরকার। মিডিয়া বা মানুষের সমালোচনা না থাকলে আমরা হয়তো বেপরোয়া হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমরা জবাবদিহির কথা মাথায় রেখেছিলাম বলেই বেপরোয়া হইনি।
প্রশ্ন: উপদেষ্টাদের মধ্যে কি কখনো মতপার্থক্য হয়েছে? হলে সেটি কীভাবে মিটমাট করতেন?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: মতপার্থক্য তো ছিলই। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছোট পরিসরে বা উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা হতো। বৃহৎ পরিসরে আসার পর অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতেন বা বলতেন যে, এটি এখন পাস করবেন না। অনেক বিল দু-তিনবারও ফেরত এসেছে। ছোটখাটো বিষয়ে দ্বিমত থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতো। তবে কিছু বিষয়ে, যেমন ট্রাইব্যুনাল বা বিচার দ্রুত করার ক্ষেত্রে সবাই একমত ছিলেন। মানবাধিকার আইনের মতো কিছু ক্ষেত্রে সময় লেগেছে, কারণ নানা পক্ষের শঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতেই নেওয়া হতো এবং বাকিদের সেটি মেনে নিতে হতো।
প্রশ্ন: অনেকেই বলেন ওই সময় একটা ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল। এ বিষয়ে আপনার কোনো ভূমিকা ছিল কি?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নামে কিছু ছিল কি না— তা আমার জানা নেই। তবে কিছু বিষয় স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা হতো, যেখানে সব উপদেষ্টা সবসময় থাকতেন না। যেকোনো বড় সিদ্ধান্তের একটা আর্থিক দিক থাকে। তাই নিয়ম অনুযায়ী এসব আলোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের পাশাপাশি অর্থ উপদেষ্টার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। সেই হিসেবে আমি প্রায় সবসময়ই এসব আলোচনায় থাকতাম।
প্রশ্ন: আপনার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন সরকারের উদ্দেশে কিছু যোগ করার আছে কি?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের উচিত দ্রুত কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া। কিছু সিদ্ধান্তে বিলম্ব হচ্ছে। যেমন : ব্যাংকিং সেক্টরে কিছু রেজল্যুশন দিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু এখন কিছু অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে। এগুলো বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনীতি ও রাজনীতির স্বার্থে এই সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন। আরেকটা পরামর্শ হলো, আমরা যেসব সংস্কার করে এসেছি, সেগুলো সুসংহত করা। নতুন করে সব শুরু না করে, আমাদের অর্জনগুলো মূল্যায়ন করে সেখান থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিলে ভালো ফল আসবে।
প্রশ্ন: আইএমএফের প্রোগ্রামের বিষয়ে আপনাদের সময় একটা কথা ছিল, কিন্তু এখন তারা দ্বিমত পোষণ করছে। আর অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে কিছু বলবেন কি?
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আইএমএফ জুনের মধ্যে অর্থ ছাড়ের কথা বলেছিল। এনবিআর আর ব্যাংক খাতে সংস্কারের শর্ত ছিল। এখন সরকার নতুন প্রোগ্রামে যাওয়ার কথা বলছে, যার চ্যালেঞ্জ অনেক। কারণ আইএমএফ তখন নতুন শর্ত জুড়ে দেবে, যা পালন করা কঠিন হতে পারে। আর অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এটি অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারলে রাজস্ব আয়ের চাপ কমত। পাশাপাশি এটি একটা মেসেজ দিত যে, পাচার করলে শাস্তি পেতে হবে। শাস্তি না হলে ভবিষ্যতের পাচারকারীরাও উৎসাহিত হবে।
প্রশ্ন: আগামীর সময়ের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
সালেহউদ্দিন আহমেদ: আগামীর সময়কে ধন্যবাদ।




